ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চিমনি ভাঙার দুই সপ্তাহের মধ্যে ফের উৎপাদনে দুই ইটভাটা

চিমনি ভাঙার দুই সপ্তাহের মধ্যে ফের উৎপাদনে দুই ইটভাটা
×

ভেঙে দেওয়া চিমনি পুনর্নির্মাণ করে ফের উৎপাদনে গেছে ভগবানপুরের হাজী ব্রিকস্‌ সমকাল

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানিকগঞ্জ জেলায় ১২৬টি ইটভাটার মধ্যে ২৪টির কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। অবৈধ এসব ইটভাটা চলেছে বছরের পর বছর। সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর দুটি ইটভাটার চিমনি গুঁড়িয়ে দিলেও ১৫ দিনের মধ্যে সেগুলো ফের ইট উৎপাদন শুরু করেছে।

জানা গেছে, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া ও সদর উপজেলায় গত ২৮ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। সেই অভিযানে সদর উপজেলার ভগবানপুর গ্রামে মেসার্স হাজী ব্রিকস্‌ ও সাটুরিয়া উপজেলার গোলড়া গ্রামে মেসার্স ফৌজিয়া ব্রিকসের চিমনি গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া সদর উপজেলার মেসার্স নূর ব্রিকস, মেসার্স আহাদ ব্রিকস-২, মেসার্স হিরো এন্টারপ্রাইজ নামে তিনটি ভাটাকে ৬ লাখ করে মোট ১৮ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের (সদরদপ্তর) ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ফয়জুন্নেছা আক্তার। 
সরেজমিন দেখা যায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায়ের তোয়াক্কা না করে দুটি ইটভাটার মালিকরা ভেঙে দেওয়া চিমনি পুনর্নির্মাণ করেছেন। গত ১৫ জানুয়ারি চিমনি নির্মাণ শেষ হলে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ইট উৎপাদন শুরু করেছেন তারা।

এদিকে ইটভাটায় চিমনি পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হলে পরিবেশ অধিদপ্তর গত ৮ জানুয়ারি ওই দুটি ইটভাটার মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ভেঙে দেওয়া ইটভাটার চিমনি নির্মাণসহ ইট উৎপাদনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, যা মোবাইল কোর্টে প্রদত্ত নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই তাদের বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। কিন্তু ওই দুটি প্রতিষ্ঠান কারণ দর্শানোর নোটিশের কোনো জবাব দেয়নি; বরং নতুন করে ইট উৎপাদনে গেছে।

সাটুরিয়ার গোলড়া গ্রামের ফৌজিয়া ব্রিকসের সহকারী ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, এই ইটভাটা ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত। ভাটা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে গোলড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকায় ২০২০ সালের পর থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের ছাড়পত্র দিচ্ছে না। মালিকপক্ষ বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে এতদিন ভাটা পরিচালনা করেছে। গত ২৮ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন এসে ভাটার চিমনি ভেকু দিয়ে ভেঙে দেয় ও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়। ভেঙে দেওয়ার দুই দিন পর মালিকপক্ষের নির্দেশে নতুন করে চিমনি নির্মাণকাজ শুরু করা হয়, যা ১৫ জানুয়ারিতে শেষ হয়। এখন পুরোদমে ইট উৎপাদন করা হচ্ছে। ৬০ লাখ ইট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এ পর্যন্ত ২০ লাখ ইট উৎপাদন হয়েছে।
সম্প্রতি সদর উপজেলার ভগবানপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মেসার্স হাজী বিকস্‌ পুরোদমে ইট উৎপাদন করছে। এই ইটভাটার ম্যানেজার জাহিদ হাসান বলেন, বর্তমান মালিক আবু বকর সিদ্দিক ২০২২ সাল থেকে এই ইটভাটা পরিচালনা করছেন। বিদ্যালয়ের কাছে ইটভাটা থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের ছাড়পত্র দেয়নি, চিমনি ভেঙে দিয়েছিল। মালিকের নির্দেশে পুনরায় চিমনি নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যে কারণে আমাদের ইটভাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, এ ধরনের অনেক ইটভাটা রয়েছে বিদ্যালয়ের কাছাকাছি। অথচ সেগুলো না ভেঙে আমাদের ইটভাটা ভেঙে দিয়েছে। যদি ভাঙতে হয় তবে জেলার অবৈধ সব ইটভাটা ভাঙতে হবে।    

ভগবানপুর গ্রামের বাসিন্দা মিলন মিয়া বলেন, তাদের গ্রামে উচ্চ বিদ্যালয়, পাশে মালুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশে এক কিলোমিটারের মধ্যে ৫ থেকে ৬টি ইটভাটা আছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ইটভাটার যন্ত্রণায় তারা অতিষ্ঠ। জমিতে ভালো ফসল হয় না, বাড়ির গাছে ফল আসে না। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে হাজী ব্রিকসে্‌র ইটভাটা  ভেঙে দেওয়ার পর গ্রামবাসী মিলে আমরা ভাটায় যাওয়ার রাস্তায় গাছের গুঁড়ি গেড়ে ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছি। কিন্ত ইটভাটার মালিক সরকারের নির্দেশ অমান্য করে আবার ইটভাটার চিমনি নির্মাণ করে ইট উৎপাদন করছে। এটি কীভাবে সম্ভব হলো সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সাটুরিয়া উপজেলার কামতা ও গোলড়া এলাকার একাধিক ব্যক্তি বলেন, ফৌজিয়া ব্রিকসের মালিক অনেক ক্ষমতাধর, যার কারণে ভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও প্রকাশ্যে চিমনি পুনঃস্থাপন করেছেন। সবকিছু ম্যানেজ করে তারা এখনও ইট পোড়াচ্ছেন। 
পরিবেশবাদী সংগঠন বারসিক এর আঞ্চলিক সমন্বয়ক বিমল রায় বলেন, মানিকগঞ্জে অধিকাংশ ইটভাটাই তিন ফসলি জমি ও বিদ্যালয় এবং আবাসিক এলাকার কাছাকাছি। এসব ইটভাটার কারণে কৃষিজমির টপ সয়েল আজ আর নেই। 

মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে গত ২৮ ডিসেম্বর হাজী ব্রিকস্‌ ও ফৌজিয়া ব্রিকসের চিমনি গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু তারা পুনরায় ইটভাটার চিমনি নির্মাণ করে। গত ৬ জানুয়ারি গিয়ে চিমনি নির্মাণের সত্যতা পাওয়া যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ৮ জানুয়ারি ভাটা দুটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। তিনি আরও বলেন, শুধু ওই দুটি ভাটা নয়, অবৈধ সব ভাটায় অভিযান পরিচালনা করা হবে। এখন দেখা যাবে তারা কতবার চিমনি নির্মাণ করতে পারে আর আমরা কতবার ভাঙতে পারি।  
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, অবৈধ কোনো ইটভাটা পরিচালনা করার কোনো সুযোগ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে যেহেতু একবার শাস্তি দিয়েছে, তারপরও সরকারি আদেশ অমান্য করে পুনরায় একই অপরাধ করছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি এবং ওই ভাটাগুলোকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হবে।   
 

আরও পড়ুন

×