শেরপুরে নির্বাচনী সহিংসতা
সংঘর্ষ-প্রাণহানির পর সতর্ক বিএনপি ও জামায়াত
শেরপুরে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ (ফাইল ফটো)
শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৪ | আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৬
ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রাণহানির পর ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছেন শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা। সংঘর্ষে জামায়াত নেতা নিহত এবং আরও কয়েকজনের অঙ্গহানির পর সতর্ক উভয় দলই। অনেকেই বলছেন, বিএনপি-জামায়াতের দুই প্রার্থীর মধ্যে মধুর সম্পর্ক থাকার পরও হঠাৎ কেন তা অবনতি হলো, এ নিয়ে জল্পনা চলছে গারো পাহাড়ের আনাচে-কানাচে। এ ঘটনাকে কেউ বলছেন পরিকল্পিত, আবার অনেকের ধারণা জেতার আগেই জিতে যাওয়ার আবেগে সৃষ্ট উচ্ছৃঙ্খলতা। আবার অনেকের ভাষ্য, রাজনীতি এখন আর নেতাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর উচ্ছৃঙ্খল একদল তরুণ সর্বত্র আধিপত্য কায়েম করেছে। বড় দলগুলোর তৃণমূলেও এর প্রভাব পড়েছে।
এদিকে জামায়াত নেতা রেজাউল করিম নিহতের ঘটনার তিন দিন পর থানায় মামলা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাতে নিহত রেজাউলের স্ত্রী মোছা. মার্জিয়া বাদী হয়ে ঝিনাইগাতী থানায় এ হত্যা মামলা করেন। মামলায় ২৩৪ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় ৪০০-৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বুধবার ঝিনাইগাতী মিনি স্টেডিয়ামে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে প্রার্থীদের ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ার দখল ঘিরে সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হন। এখনও উভয় দলের অন্তত ১০ থেকে ১২ কর্মী হাসপাতালে ভর্তি। বৃহস্পতিবার রাতে জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ঝিনাইগাতী যুবদল নেতা আমজাদ হোসেনের অবস্থা সংকটাপন্ন হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহে চিকিৎসাধীন জামায়াত নেতা তাহেরুল ইসলামের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেঁচে থাকলেও তিনি চিরতরে পঙ্গু হয়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে এক চোখ হারিয়েছেন বিএনপি কর্মী সুজাউদ্দৌল্লা।
শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী উভয় উপজেলার স্থানীয়রা জানান, শেরপুর-৩ আসনের বিএনপিপ্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল অত্যন্ত নম্র-ভদ্র, বিনয়ী ও সদালাপী। জামায়াত প্রার্থী শিক্ষক নুরুজ্জামান বাদলও অত্যন্ত সরল ও সজ্জন ব্যক্তি। দুই প্রার্থীর গ্রামের বাড়িও একই উপজেলায়। রুবেলের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইগাতীর কেকেরচর। তাঁতীহাটি ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুজ্জামান। এই দুই প্রার্থী ও তাদের দলের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কও চমৎকার।
শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে উভয় প্রার্থীর পুরোনো দুটি ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটিতে দেখা যাচ্ছে ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি গুরুতর অসুস্থ নুরুজ্জামানকে দেখতে গেছেন মাহমুদুল হক রুবেল ও জেলা বিএনপি নেতা আবু রায়হান রুপন। অপর ছবিতে দেখা যায় ২০২৩ সালের জুনে রুবেল অসুস্থ হলে জামায়াত নেতা সদর আসনের এমপি প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম তাঁকে দেখতে হাসপাতালে গেছেন। গতকাল আশরাফুল আলম নামে ঝিনাইগাতীর এক ভোটার ছবি দুটি পোস্ট করে লেখেন–‘সময় সম্পর্ক বদলে দেয়’। আরেকজন ভোটার একই ছবি পোস্ট করে লিখেছেন– ‘স্বার্থের মিত্র এখন শত্রু। কিন্তু কেন এ অবস্থার সৃষ্টি হলো?’
এদিকে গতকাল সামাজিক মাধ্যমে ২৮ জানুয়ারির সংঘর্ষের কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এর একটিতে দেখা যায় জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামানকে ইউএনও, ওসি ও সেনাসদস্যরা অনুরোধ করছেন, তিনি যেন ঝিনাইগাতী বাজারে বিএনপি অফিসের সামনে দিয়ে না গিয়ে কর্মীদের নিয়ে বিকল্প পথে শ্রীবরদী চলে যান। এ সময় ইউএনও এবং ওসির ফোন থেকে নুরুজ্জামান বাদলের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। নুরুজ্জামান কিছুতেই বিকল্প পথে যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। কয়েক দফায় অনুরোধ করার পরও তিনি শেষ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথের দিকে অগ্রসর হন।
আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান রুপন ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শওকত হোসেন বিএনপি অফিসের সামনে দিয়ে না যাওয়ার জন্য জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামানকে বারবার অনুরোধ করছেন। নুরুজ্জামান বলেন, ‘আমাকে মেরে ফেললেও আমি এ সড়ক দিয়েই যাব।’ পরে রাত হয়ে যাওয়ায় সেনাসদস্য ও পুলিশ সদস্যরা কর্মীসহ তাঁকে নিয়ে যাওয়ার সময় দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে জামায়াতপ্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল বলেন, ‘প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কর্মীদের নিরাপত্তার জন্যই আমি বিকল্প পথে যেতে চাইনি। কারণ তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। বিকল্প পথে গেলে বিপদ আরও বাড়ত। যেখানে পুলিশ-সেনাবাহিনীর সামনে আমাদের অনেক নেতাকর্মীর ওপর হামলা হয়, সেখানে বিকল্প পথে গেলে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটত।’
এ ব্যাপারে বিএনপিপ্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, ‘আমাদের তরফ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে; যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু না হয়। কিন্তু ভিডিও দেখলে সবাই বুঝতে পারবেন
সেদিন আমার কিংবা আমাদের কর্মীদের কতটুকু দায় ছিল। আমাদের নেতারা একাধিকবার বাদল সাহেবকে অনুরোধ করেছেন। তিনি কারও অনুরোধ রক্ষা করেননি।’
এদিকে সংঘর্ষ ও হতাহত-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আবারও সহিংসতা হয় কিনা তা নিয়ে চিন্তায় শেরপুর-৩ আসনের মানুষ। ঝিনাইগাতী বাজার বড় মসজিদের ইমাম ও হেফাজত ইসলামের জেলা আমির মুফতি খালিসুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ পরবর্তী সময়ে একদল উচ্ছৃঙ্খল তরুণ ও যুব সমাজের উদ্ভব হয়েছে। তারা সারাদেশেই রয়েছে। ঝিনাইগাতীতে তারাই হতাহতের ঘটনায় জড়িত। প্রশাসনের সামনে সড়কে একটি লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলল, এদের কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। তারা নেতা, মুরব্বি কাউকে মানে না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভোটে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।’
উপজেলা বণিক সমিতির সভাপতি মোখলেছুর রহমান খান বলেন, ‘জামায়াত নেতা নুরুজ্জামান বাদল যদি প্রথম সংঘর্ষের পর নেতাকর্মী নিয়ে বিকল্প পথে চলে যেতেন, তাহলে এ ঘটনা ঘটত না। নোংরা রাজনীতি চলছে। বিএনপিপ্রার্থী রুবেল চেষ্টা করেছেন কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন্তু অনেক কর্মী আহত হওয়ায় তাঁর হাতে নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ঘটনাস্থলে সেনাসদস্য ও পুলিশ ছিলেন। সংখ্যায় এতই নগণ্য যে উচ্ছৃঙ্খলদের ঠেকাতে তা যথেষ্ট ছিল না। অথচ ঘটনাস্থলে থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বে দুটি বিজিবি ক্যাম্প ছিল। দ্রুত বিজিবি মোতায়েন করা হলে এ দুঃখজনক ঘটনা ঘটত না।’
জামায়াত নেতা হত্যার প্রভাব সম্পর্কে শ্রীবরদী উপজেলার সিংগাবরুনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফখরুজ্জামান কালু বলেন, ‘২০২৪-এর ৫ আগস্টের পরে এ ইউনিয়নে বিএনপি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। সেটি অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে বিএনপি। এ হত্যার পর যেখানে জামায়াতের অবস্থান ছিল না, সেখানে তারা কিছুটা এগিয়েছে। তবে যে আতঙ্ক তৈরি হলো, সেটি কাটিয়ে উঠলে এগিয়ে যাবে বিএনপি।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রচুর ভোট আছে এ ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী রানিশিমূল ইউনিয়নে। তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত। উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ নেতা মিঠুন সাংমা বলেন, ‘আমাদের এলাকায় দুটি ভোটকেন্দ্রে দুই হাজারের ওপরে আদিবাসী ভোটার। হত্যার ঘটনার পর ভীষণ ভয়ে
আছেন তারা।’
ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন বলেন, এখানে জামায়াতের ভোট সামান্য বেড়েছে। তবে অনেক বেশি ভোট পাবে বিএনপি। জামায়াত নেতা হত্যার প্রভাব কিছুটা পড়েছে। অনেকেই ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে চাইছে না।
এদিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো বিএনপি নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা বলেন, ভোটারদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। ঘটনায় দায় প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী এড়াতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জেলা জামায়াতের মাওলানা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের জনশক্তি ভয় পায় না। সন্ত্রাসীদের তারা কোনোভাবেই আশ্রয় দেবে না। আমরা মনে করি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বিএনপি তাদের পরাজয় ডেকে এনেছে।’
শেরপুরের পুলিশ সুপার কামরুল হাসান বলেন, ‘আমরা সব দলের কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা আশা করি। সংঘর্ষের সময়কার তথ্য সংগ্রহ, ফুটেজ বিশ্লেষণ হচ্ছে। যে কোনো সময় মামলা হবে।’
