পাহাড়ে মাতৃভাষায় পাঠদানে সাফল্য নেই ৯ বছরেও
ছুটির পর বাড়ি ফিরছে সুরবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আসামবস্তি -কাপ্তাই সড়ক থেকে সম্প্রতি তোলা সমকাল
সত্রং চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাহাড়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদান কার্যক্রম চালু হওয়ার ৯ বছর পার হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি, পরীক্ষায় মূল্যায়ন খাতায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না হওয়া, পরিকল্পিত বাস্তবায়নের অভাব এবং আর্থিক প্রণোদনার সংকটের কারণে উদ্যোগটি কার্যত থমকে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকার প্রতিবছর নিয়মিত এসব ভাষায় পাঠ্যবই বিতরণ করলেও মাঠ পর্যায়ে পাঠদান কার্যক্রম বারবার হোঁচট খাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিতে পাহাড়ের নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরেপড়া রোধ এবং শিক্ষায় এগিয়ে নিতে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা চালুর কথা উল্লেখ রয়েছে।
সে ধারাবাহিকতায় সরকার ২০১৭ সালে পাহাড়ে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় এবং সমতলে গারো ও সাদরি ভাষায় পাঠ্যবই প্রবর্তন করে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হাতে মাতৃভাষায় রচিত বই তুলে দেওয়া হয়। পাহাড়ে মূলত তিন জনগোষ্ঠী- চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষায় পাঠদান শুরু হলেও দীর্ঘ ৯ বছরেও তা কার্যকর রূপ পায়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাতৃভাষার বই পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত না থাকায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কম। বিদ্যালয়গুলোতে সপ্তাহে একদিন মাতৃভাষায় পাঠদান করা হলেও পর্যাপ্ত ও ভাষাভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় তা নিয়মিত ও মানসম্মতভাবে পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না।
চলতি শিক্ষাবর্ষে রাঙামাটির ১০ উপজেলায় প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ১৩ হাজার ১৩৪টি এবং প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ৪৯ হাজার ২৯২টি মাতৃভাষার পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন। মাতৃভাষায় পাঠদান চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার ৭১২ জন শিক্ষককে ১২ থেকে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাষাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রাঙামাটির যোগেন্দ্র দেওয়ানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাতৃভাষার শিক্ষক রিয়া চাকমা জানান, ২০১৭ সাল থেকে পাঠদান করালেও তিনি কোনো বেতন-ভাতা পাননি। এতে পারিবারিক আর্থিক সংকটের পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবে আগ্রহেও ভাটা পড়ছে।
বেসরকারি সংস্থা ইনিশিয়েটিভ ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের (আইএসডি) নির্বাহী পরিচালক ও মাতৃভাষা গবেষক প্রণব চাকমা বলেন, ‘মাতৃভাষায় যে পাঠদান করা হচ্ছে, তা অনেকাংশে লোকদেখানো।’ তিনি জানান, ২০১৭ সালে আইএসডির মাধ্যমে দুই হাজার ৩৯০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫০ জন শিক্ষক বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণসহ পাঠদান চালিয়ে গেলেও তারা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।
রাঙামাটি পাবলিক কলেজের শিক্ষক ও ভাষা গবেষক মুকুল কান্তি ত্রিপুরা বলেন, মাতৃভাষা শিক্ষা এখন ‘অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার’ মতো অবস্থায় আছে। শিক্ষক ও প্রশিক্ষণ সংকটের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মানস মুকুর চাকমা বলেন, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে ১২ থেকে ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি জেলা পরিষদের সভায় মাতৃভাষার শিক্ষক নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, পাঠ্যবই বিতরণ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান। জেলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে পাহাড়ি শিক্ষকদের মাতৃভাষায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আরও শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- স্কুলছাত্র
