ক্ষতির মুখে হাজার বিঘা কৃষিজমি
সেচের অভাবে ফেটে চৌচির ধানক্ষেত। শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার সোনাতলা গ্রাম থেকে তোলা। ছবি: সমকাল
মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ | ১২:৩৬
শুষ্ক মৌসুমে চিকনদিয়া খালে পানি থাকে না। এ কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার প্রায় এক হাজার বিঘা জমি পড়ে থাকে অনাবাদি। প্রায় এক যুগ ধরে এভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষককে। ডিজেলচালিত সেচে কিছু জমি চাষ হলেও অধিকাংশ কৃষককে বাড়তি খরচ দিতে গিয়ে গুনতে হয় লোকসান।
স্থানীয় কৃষকের দীর্ঘদিনের দাবির পর অবশেষে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ওই এলাকায় একটি সেচ পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। তখন কৃষকের মনে আশার আলো জেগেছিল। কিন্তু মাঠে ধানের চারা রোপণের পরই দেখা দেয় নতুন সংকট। অভিযোগ উঠেছে, সেচ পাম্পের জন্য মোটর ও বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সরকারি বরাদ্দের টাকাই কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে। কোথাও ‘আবেদন ফি’ কোথাও ‘সংযোগ ফি’র নামে টাকা আদায় করা হচ্ছে।
গোয়ালনগর ইউনিয়নের ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চিকনদিয়া খালটি ধীরে ধীরে পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। এই খালের আশপাশে চারটি বিলের প্রায় এক হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করে কৃষক। কিন্তু বিএডিসির সেচ প্রকল্প থেকে মোটর ও পল্লী বিদ্যুৎ থেকে মিটার না পাওয়ায় চাষাবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাই পাশের সরাইল উপজেলা থেকে একটি পুরোনো সেচ প্রকল্পের মোটর এনে দেওয়া হয় সোনাতলা গ্রামের কৃষক আব্দুর নূর মিয়াকে। তাঁর অভিযোগ, ওই মোটরের পুরোনো বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ বাবদ তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অথচ এই খরচ বিএডিসি কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা।
সেচ পাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য গত বছরের ১৮ অক্টোবর আবেদন করেছিলেন মো. আব্দুর নূর মিয়া। কিন্তু সেচের মৌসুম শেষ হতে চললেও পাম্প বসানোর কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। উল্টো অভিযোগ উঠেছে, মিটার সংযোগ দ্রুত পেতে পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিসে টেকনিশিয়ান মুসলিম মিয়া অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা চেয়েছেন।
জানা গেছে, পল্লী বিদ্যুতের জোনাল অফিসে প্রতিটি স্বাক্ষরের মূল্য হিসেবে দিতে হয় ৯ হাজার টাকা। আবেদন করলে দিতে হয় চার হাজার টাকা। চাইলেই কোনো কৃষক জোনাল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট এলাকার দালাল বা ইলেকট্রিশিয়ানদের মাধ্যমে দেখা করতে দিতে হয় উৎকোচ।
কৃষক আব্দুর নূর মিয়ার ভাষ্য, টেকনিশিয়ান মুসলিম মিয়া সেচ প্রকল্পের মিটারের আবেদন বাবদ নিয়েছেন চার হাজার টাকা, এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে স্বাক্ষর পেতে তাঁকে দিতে হয়েছে ৯ হাজার টাকা করে। আর মিটারের সংযোগ পেতে লেগেছে ৫৭ হাজার টাকা।
শুক্রবার সরেজমিন দেখা গেছে, সোনাতলা গ্রামের পাশে চারটি বিলে প্রায় এক হাজার বিঘা জমিতে ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। কিন্তু পানির অভাবে অধিকাংশ চারা লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আরও দুই-আড়াইশ বিঘা জমি পানির অভাবে আবাদই করা যায়নি।
কৃষক মজনু মিয়া বলেন, ‘সুদের উপর টাকা আইন্যা ৫ বিঘা জমি আবাদ করছিলাম। কিন্তু পানির অভাবে জমি লাল হইয়া গেছে। জমিতে ধান না হইলে পরিবার নিয়া এলাকা ছাড়তে হবে। মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা নিছি। সময়মতো শোধ দিতে না পারলে ঘরবাড়ি ছাইড়া চইলা যাইতে হইব।’
অপর কৃষক সুহেল মিয়া ১০ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন। এ জন্য সুদের ওপর নিতে হয়েছে এক লাখ টাকা। তিনি বলেন, ‘পানির অভাবে পুরা জমি মইরা যাইতেছে। ধানের অবস্থা দেখলে মনডা খারাপ হইয়া যায়। যদি জমিতে পানি দিতেই না পারি তাইলে ক্ষেতে ধান হইব না। ধান না হইলে সুদের টাকা পরিশোধ করতাম পারুম না। পুলা-মাইয়া লইয়া এলাকা ছাইড়া দিতে হইবে।’
বক্তব্য জানতে টেকনিশিয়ান মো. মুসলিম মিয়ার মোবাইল ফোনে কল দিলেও ধরেননি। নাসিরনগর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (প্রকৌশলী) মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমার অফিসের কেউ অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত না। তবে টেকনিশিয়ান মুসলিমের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ শুনেছি। কিন্তু কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সেচ প্রকল্পে মিটার স্থাপনের জন্য তিনি বা অফিসের কেউ টাকা নেননি।
বিএডিসি উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘এ অর্থবছরে আমাদের সরকারি বরাদ্দ নেই। তাই কৃষকের সম্মতিতেই পুরোনো মোটর ও নিজ খরচে মিটার সংযোগ পেতে রাজি হন আব্দুর নূর। এ জন্য পুরোনো মোটরের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ২০ হাজার ও নতুন মিটার বাবদ ৫৭ হাজার টাকা দিয়েছেন। আমাদের বরাদ্দ থাকলে সরকারিভাবে সব সরবরাহ করা হতো।’
ইউএনও শাহীনা নাসরিন বলেন, কৃষক ও কৃষি নিয়ে কেউ কোনো অনিয়ম করলে তা সহ্য করা হবে না। মাঠের ফসল বাঁচাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে মিটার স্থাপনে ব্যবস্থা নেবেন। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দেন।
- বিষয় :
- নাসিরনগর
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া
