ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রামে জোড়াতালি দিয়ে চলছে দগ্ধদের চিকিৎসা, শয্যা মাত্র ২৬

চট্টগ্রামে জোড়াতালি দিয়ে চলছে দগ্ধদের চিকিৎসা, শয্যা মাত্র ২৬
×

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৮ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ১০:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত পাঁচ বছরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ৮৫১টি। এর মধ্যে গত এক বছরেই অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে গেছে রেকর্ড ১৩০ জনের প্রাণ। সাম্প্রতিক সময়ে বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়লেও চিকিৎসার আধুনিকায়ন হয়নি। চট্টগ্রামে আগুনে পোড়া ও দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা চলছে জোড়াতালি দিয়েই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের ২৬টি শয্যায় লাখ লাখ মানুষের একমাত্র ভরসা। 

তবে এই ইউনিটে নেই দগ্ধ রোগীর অতি প্রয়োজনীয় ডেডিকেটেড আইসিইউর ব্যবস্থা। নেই এইচডিইউর সুবিধা। কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের (ব্যারিয়ার নার্সিং) সুযোগও এখানে নেই। নেই আধুনিক ড্রেসিং ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স। স্থান সংকুলান না হওয়ায় পোড়া রোগীকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। 
বার্ন ইউনিটের তথ্য বলছে, গত এক বছরে এখানে দেড় হাজারের বেশি রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৩০ জনের। গুরুতর ৭০ জনকে ঢাকায় পাঠাতে হয়। যার মধ্যে পথেই মৃত্যু হয়েছে বেশ কয়েকজনের। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই অন্তত ১০টি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ গেছে সাতজনের। গুরুতর দগ্ধ অন্তত ১৮ জনকে ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী। 

চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর আবাসিক এলাকায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি ছয়তলা ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে নারী-শিশুসহ ৯ জন দগ্ধ হন। তাদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। সবার শারীরিক অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। তবে আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় সবাইকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠাতে হয়। তবে ঢাকায় নেওয়ার পথেই নুরজাহান বেগম রানী নামে একজন মারা যান। ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে একে একে মৃত্যু হয় আরও পাঁচজনের। 
এ ঘটনার দুদিন পর ২৫ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার শহরের কলাতলী বাইপাস সড়কের কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন পাম্পে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৬ জন দগ্ধ হন। গুরুতর দগ্ধ ছয়জনকে চমেকের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজনের আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। তবে ডেডিকেটেড আইসিইউ না থাকায় তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগে শয্যা খালি পাওয়া সাপেক্ষে মাত্র একজনকে আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া যায়। পরে আরও দুজনকে সেখানে স্থানান্তর করতে পারেন চিকিৎসকরা। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ৯০ শতাংশ দগ্ধ হওয়া গুরুতর আবু তাহেরকে ঢাকার বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত ১ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়। 
এই দুই ঘটনার মতো চট্টগ্রামে কিছুদিন ধরে প্রায়ই ঘটছে বড় বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড। মুমূর্ষু অনেককে চমেকের বার্ন ইউনিটে আনা হলেও উন্নত চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। ইউনিটে আইসিইউ না থাকায় কম সময়ের ব্যবধানে মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। 

এ ব্যাপারে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, বিভাগের ১১ জেলার আর কোথাও বার্ন ইউনিট না থাকায় সব রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এ কারণে এখানে রোগীর চাপ কয়েক গুণ। এখানকার বার্ন ইউনিটটি এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়নি। নানা সংকটের কথা জানিয়ে বেশ কয়েকবার চিঠিও পাঠানো হয়েছে। বিশেষায়িত একটি বার্ন ইউনিটের কাজ চলছে। বার্ন ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ বলেন, নানা  সীমাবদ্ধতার কারণে বেশি পুড়ে যাওয়া রোগীকে এখানে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। আগুনে পোড়া বা বিস্ফোরণে দগ্ধ রোগীর জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ বার্ন ইউনিট জরুরি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বার্ন ইউনিটের এক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক বলেন, দগ্ধ রোগীকে দ্রুত সময়ের মধ্যে উন্নতর চিকিৎসা দেওয়া না গেলে হুমকিতে পড়ে জীবন। অথচ এমন বাস্তবতায় চট্টগ্রামে ডেডিকেটেড আইসিইউর মতো উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নেই। 

জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, এত বছর পরও চট্টগ্রামে বিশেষায়িত বার্ন হাসপাতাল গড়ে না ওঠা দুর্ভাগ্যের। 
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, চমেকের বর্তমান বার্ন ইউনিটটি এই অঞ্চলের পাঁচ কোটির বেশি মানুষের একমাত্র রেফারেন্স হাসপাতাল। অথচ এখানে দগ্ধ রোগীদের পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগ নেই। আইসিইউর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট ছাড়া জোড়াতালি দিয়ে চলছে এটি। প্রশাসনের কাছে একাধিকবার নতুন বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট নির্মাণের দাবি জানালেও এত বছরেও তা দৃশ্যমান হয়নি।

হালিশহরে বিস্ফোরণে নিহত নুরজাহানের স্বজন মনসুর আলী বলেন, গুরুতর দগ্ধ নুরজাহানকে চমেকের বার্ন ইউনিটে আনা হলেও মেলেনি পর্যাপ্ত চিকিৎসা। ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। 
২০২২ সালের ৪ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৩ ফায়ার ফাইটারসহ অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আহত হন দুই শতাধিক। সে ঘটনায় গুরুতর ২২ রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হয় ঢাকায়। যার মধ্যে বেশ কয়েকজনের পথেই মৃত্যু হয়। তখন অভিযোগ ওঠে, জরুরি মুহূর্তে চিকিৎসা না পেয়েই মৃত্যু হয়েছে তাদের। এ ঘটনার পর চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ চমেকের বার্ন ইউনিটকে সমৃদ্ধ করতে ও নতুন বার্ন ইউনিট নির্মাণের দাবিতে লাগাতার বিক্ষোভ 
কর্মসূচি পালন করে। চমেক হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডের পাশে ২০০৮ সালে ১৩ শয্যার বার্ন ইউনিটটি চালু করা হয়। পরে ২০১২ সালের ৭ জুন হাসপাতালের ছয়তলায় প্রসূতি ওয়ার্ডের পাশে এটিকে সরকারিভাবে ২৬ শয্যায় উন্নীত করা হয়। সেই থেকেই জোড়াতালি দিয়ে চলছে পোড়া রোগীর চিকিৎসা। 

আরও পড়ুন

×