গ্রাম পুলিশ
‘সাইকেলটাই আমার ডানা ধুলোমাখা পথ কর্মশালা’
ধর্মহাটা গ্রামের এক গৃহবধূকে জন্ম নিবন্ধনের সনদ তুলে নিচ্ছেন রীনা খাতুন সমকাল
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভোরের কুয়াশা চিরে যখন মেঠোপথ জেগে ওঠে, তখনই চাকার শব্দে মুখর হয় সরদহ ইউনিয়নের নিঝুম গ্রামগুলো। নীল পোশাকের এক নারী, কাঁধে একরাশ দায়িত্ব আর দুই চাকায় ভর করে উড়িয়ে চলেছেন অভাবের ধুলোবালি। তিনি রীনা খাতুন; যার সাইকেলের প্যাডেলে ঘোরে একটি পরিবারের চাকা, হৃদয়ে স্পন্দিত হয় এক জনপদের নিরাপত্তা। তিনি শুধু একজন গ্রাম পুলিশ নন; এই জনপদে সংগ্রামের এক জীবন্ত কবিতা, সাহসের মূর্ত প্রতীক।
বাবার পথ ধরে দায়িত্বের শুরু
রীনার গল্পটা শুরু হয় ২০০৭ সালে। বাবা মুনসুর রহমান ছিলেন এই ইউনিয়নেরই চৌকিদার। বাবার মৃত্যুর পর যখন সংসারের প্রদীপ নিভে যাওয়ার উপক্রম, তখন মাত্র এক হাজার ৪০০ টাকা বেতনে বাবার সেই পুরোনো পেশাককেই আঁকড়ে ধরেন রীনা। আজ ১৮ বছর পর বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকায় ঠেকলেও তাঁর সংগ্রাম কমেনি এক চুলও। অসুস্থ মা আর ১০ বছরের ছোট্ট মেয়ে হাফসাকে নিয়ে এই ছোট সংসার এখন তাঁরই কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে।
প্রতিদিন সকাল ৯টা বাজলেই রীনা হাজির হন ইউনিয়ন পরিষদে। শুরু হয় তাঁর আসল যুদ্ধ। কোনোদিন জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের সংগ্রাহক, কোনোদিন কর আদায়ের দক্ষ কর্মী, আবার কোনোদিন প্রশাসনের জরুরি বার্তা নিয়ে হাজির হন গৃহস্থের দুয়ারে। প্রতিদিন ৩০ কিলোমিটার পথ তিনি সাইকেলে পাড়ি দেন। রীনা হাসিমুখে বলেন, ‘আমি কখনও কোনো কাজকে ঝক্কি মনে করি না। গ্রামের মানুষ আমায় নিজের মেয়ের মতো দেখে। এই সাইকেলটাই আমার ডানা, আর এই ধুলোমাখা পথই আমার কর্মশালা।’
অভাবের কারণে রীনা নিজে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। নিজের না পাওয়ার বেদনাকে তিনি মেয়ের স্বপ্নে রূপান্তরিত করেছেন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া মেয়ে হাফসার জন্য প্রাইভেট টিউটর রাখার সামর্থ্য নেই, তাই সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে রাত জেগে নিজেই মেয়েকে পড়াতে বসেন। রীনা বলেন, ‘আমি যা হতে পারিনি, হাফসাকে তা করে তুলবই। নতুন জামা বা খাতা সব সময় দিতে পারি না ঠিকই; কিন্তু ওর বড় হওয়ার স্বপ্নে আমি কখনও কার্পণ্য করি না।’
‘করোনা আপা’ ও মানবিকতার জয়গান
মহামারির সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে যখন মানুষ ছায়ার সঙ্গে কথা বলতেও ভয় পেত, তখন রীনা ছিলেন নির্ভীক। বাড়ি বাড়ি গিয়ে জ্বরের রোগী খোঁজা, হাসপাতাল থেকে ওষুধ এনে পৌঁছানো কিংবা ত্রাণের বস্তা সাইকেলে বেঁধে বিলি করা– সবই করেছেন একা হাতে। গ্রামবাসী ভালোবেসে তাঁর নাম দিয়েছিল ‘করোনা আপা’। আজও বিপদে-আপদে সবার আগে রীনার সেই পরিচিত সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পায় ইউনিয়নবাসী।
সরদহ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এস এম সাইদুর রহমান এবং স্থানীয় অধ্যাপক মো. শরিফুল ইসলাম– সবার কণ্ঠেই রীনার প্রশংসা। তাদের মতে, রীনা শুধু একজন কর্মী নন, তিনি গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ও নিষ্ঠার এক দুর্লভ উদাহরণ।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে চারঘাটের এই লড়াকু নারী মনে করিয়ে দেন– স্বপ্ন কখনও মরে যায় না, তা শুধু রূপ বদলায়। রীনা খাতুনের এই নীরব পদযাত্রা গ্রামীণ বাংলাদেশের হাজারো অদম্য নারীর প্রতিচ্ছবি, যারা প্রতিদিন প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে গড়ে তুলছেন নতুন এক ইতিহাস।
- বিষয় :
- জন্ম নিবন্ধন
