দৌলতদিয়ায় বাসডুবি
বাবার কবরের মাটি বুকে নিয়ে ঘুমায় শিশু আমেনা
চার দিনেও নিহত চালকের খোঁজ নেয়নি বাস কর্তৃপক্ষ
দুই শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা ছেলের বউকে নিয়ে অকূল পাথারে মা তাসলিমা
সোহেল মিয়া, বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী)
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৬ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
৯ বছরের শিশু আমেনা। বাবার কবরের মাটি হাতে করে এনে প্রতিরাতে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে ঘুমায়। মা ও দাদি শত চেষ্টা করেও সেই মাটি সরাতে পারেন না। মাঝেমধ্যেই ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। ঈদে বাবার কিনে দেওয়া নতুন জামাটি বারবার দেখে আর কান্নায় ভেঙে পড়ে।
শনিবার সকালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পশ্চিম খালকুলা গ্রামে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। গত বুধবার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসের চালক নিহত আরমান খান (৩১) আমেনার বাবা। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া আরমান মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকেই মোটরযানের সঙ্গে যুক্ত হন। স্থানীয় এক পরিচিতের মাধ্যমে সৌহার্দ্য পরিবহনে চালক হিসেবে কাজ পান। সরকারি খাস জমিতে ছোট দোচালা টিনের ঘরে মা তাসলিমা বেগম, স্ত্রী লাবণী আক্তার এবং দুই মেয়ে আমেনা (৯) ও তায়েবা (৫)-কে নিয়ে তাঁর ছোট্ট সংসার।
আমেনা স্থানীয় শহীদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী, আর ছোট মেয়ে তায়েবা পড়ে শিশু শ্রেণিতে। আরমানের স্ত্রী বর্তমানে দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা.
আরমানের মা তাসলিমা বেগম জানান, ২৫ রোজায় শেষবার বাড়িতে এসেছিলেন ছেলে। এক দিন থেকে আবার কাজে চলে যান। ঈদেও আর ফেরা হয়নি তাঁর। দুর্ঘটনার আগের দিন একাধিকবার মায়ের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘মা, চিন্তা করো না। ঈদের পর এসে তোমার জন্য নতুন ঘর বানিয়ে দেব।’
মায়ের কাছে আরেকটি ছোট্ট আবদারও করেছিলেন, ‘আমি তো মিষ্টি পছন্দ করি না, তুমি ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়াবে।’ কিন্তু সেই ইচ্ছে আর পূরণ হয়নি। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন মা।
স্ত্রী লাবণী আক্তার জানান, স্বামী খুবই
যত্নশীল ছিলেন। অভাবের সংসার হলেও কখনও খারাপ ব্যবহার করেননি। দুর্ঘটনার আগের দিন ফোনে তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘দুই মেয়েকে সব সময় কাছে রাখবে, নিজের শরীরেরও যত্ন নিও।’ স্ত্রীর যত্নের কথা বলেই তিনি যেন নিজেই সবার অগোচরে চলে গেলেন।
আরমানই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তায়। মা তাসলিমা বেগম বলেন, ‘কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে এতিম দুই মেয়েকে মানুষ করব, আর গর্ভবতী বউমার চিকিৎসা করাব– কিছুই বুঝতে পারছি না।’
একদিকে সন্তান হারানোর বেদনা, অন্যদিকে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা– সব মিলিয়ে দুঃসহ সময় পার করছে পরিবারটি।
চার দিনেও খোঁজ নেয়নি বাস কর্তৃপক্ষ
অভিযোগ উঠেছে, দুর্ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও সৌহার্দ্য পরিবহনের মালিকপক্ষ থেকে পরিবারের খোঁজ নেওয়া হয়নি। আর্থিক সহায়তা তো দূরের কথা, কোনো ধরনের যোগাযোগও করেনি তারা।
প্রতিবেশী মোয়াজ্জেম শেখসহ স্থানীয়রা বলেন, এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো মালিকপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে দুই শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি প্রশাসনের কাছে পরিবারটির পুনর্বাসনের দাবি জানান।
বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। খাস জমি পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী পরিবারটিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সৌহার্দ্য পরিবহনের মালিক আকতারুজ্জামান হাসান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
- বিষয় :
- বাস দুর্ঘটনা
