দেওড়াছড়া চা বাগান
অন্তঃসত্ত্বা শ্রমিকের মৃত্যু, বিক্ষোভের মুখে ব্যবস্থাপকের পদত্যাগ
ছবি: সমকাল
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ২২:৪১
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা বাগানে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী চা শ্রমিকের মৃত্যুতে কর্মবিরতিতে গেছেন শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দেওড়াছড়া চা বাগানের শ্রমিকেরা এ কর্মবিরতি পালন করে বিক্ষোভ করেন। শুক্রবারও বাগানের পরিবেশ ছিল থমথমে।
অভিযোগ রয়েছে, রিয়া বেগম নামের ওই চা শ্রমিক বাগান ব্যবস্থাপকের কাছে চিকিৎসা সহায়তা চেয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সহায়তা না পাওয়ায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন রিয়া–এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বাগানের শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করছেন। তাদের চাপের মুখে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাগান ব্যবস্থাপক পদত্যাগ করেন।
চা শ্রমিকেরা জানান, দেওড়াছড়া চা বাগানের নারী চা শ্রমিক রিয়া বেগম অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে বাগান ব্যবস্থাপকের কাছে চিকিৎসা সহায়তা চাওয়া হয়। বাগান থেকে চিকিৎসা সহায়তা করা হয়নি। ১০ থেকে ১২ দিন নামে মাত্র চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন রিয়া। এমন পরিস্থিতিতে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ১ এপ্রিল মধ্যরাতে সিলেটের একটি হাসপাতালে তাঁকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিয়া বেগমের মৃত্যু হয়।
এ ঘটনার পর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন রিয়া বেগম–এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দেওড়াছড়া চা বাগানের শ্রমিকেরা কর্মবিরতি দিয়ে বিক্ষোভ করেন। নিহত রিয়া বেগম দেওড়াছড়া চা বাগানের স্থায়ী শ্রমিক ছাব্বির মিয়ার স্ত্রী।
শুক্রবারও দেওড়াছড়া চা বাগানের বিক্ষুব্ধ চা শ্রমিকদের বড় একটি অংশ কর্মবিরতি পালন করেছেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন রহিমপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান সিতাংশু কর্মকার।
চা শ্রমিকের কর্মবিরতি ও বিক্ষোভে কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন দেওড়াছড়া বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুবোধ কুর্মি, নাজির আহমদ, সঞ্জয় কানু, পলাশ কর্মকার, ছালু মিয়া, লক্ষ্মীনারায়ণ, ইব্রাহিম মিয়া, সুভাষ ভৌমিজ, বাবুলাল ভৌমিজ, অজয় ভৌমিক, সেলিম মিয়া, জসিম মিয়া, বায়না মিয়া, সঞ্জয় কানু, শুকুর মিয়াসহ শ্রমিকেরা।
ঘটনার খবর পেয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে সংহতি জানাতে ছুটে যান বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-দলই ভ্যালির সভাপতি ধনা বাউরী, রহিমপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান সিতাংশু কর্মকার, রহিমপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি অলিউর রহমান জয়নু এবং মুন্সীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার চৌধুরী লিটন। তারা বাগান কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতার তীব্র নিন্দা এবং রিয়া বেগমের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও বাগানে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করার দাবি জানান।
আন্দোলনকারী চা শ্রমিকেরা বলেন, টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় রিয়া বেগম গত বুধবার রাতে মারা গেছেন। বাগান ব্যবস্থাপকের কাছে সহায়তা চাওয়া হলে সহায়তা মেলেনি। এজন্য তারা কর্মবিরতি দিয়ে বাগান ব্যবস্থাপকের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
শ্রমিকরা আরও বলেন, জহিরুল হক দেওড়াছড়া চা বাগানে ভারপ্রাপ্ত বাগান ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদানের পর থেকে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি করে আসছিলেন। তারা মনে করেন দেওড়াছড়া চা বাগানে ভালো একজন ব্যবস্থাপক নিয়োগ দিলে বাগানের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে। এর আগে তিনি বড়লেখার পাথারিয়া চা বাগানে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সেখানেও অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে বদলি হন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-দলই ভ্যালির সভাপতি ধনা বাউরী বলেন, চা বাগান কর্তৃপক্ষ দায় স্বীকার করেছে। বিষয়টি সমাধান করার জন্য বলা হলেও বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা ব্যবস্থাপকের পদত্যাগ দাবি করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক পদত্যাগ করায় শ্রমিকেরা আন্দোলন স্থগিত করে ঘরে ফিরে যান।
তবে এ ঘটনায় দেওড়াছড়া চা বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বাগান ব্যবস্থাপক জহিরুল হক তাঁর দায় স্বীকার করেছেন। তিনি উপস্থিত শ্রমিকদের সামনেই চিকিৎসা সহায়তা না দিতে পারার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পরে তিনি লিখিতভাবে পদত্যাগ করেন।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ শুক্রবার সকালে সমকালকে জানান, দেওড়াছড়া চা বাগানের ভারপ্রাপ্ত জহিরুল হক নিরাপত্তাজনিত কারণে বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করেন। এ বিষয়ে অচিরেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
