রেলের দুই ভাইয়ের গল্প
ছোট ভাই নাজমুল এখন ১৩ বছরের বড়
রেলের চাকরির জন্য এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ
মহিদুল ইসলাম, নাজমুল ইসলাম
যশোর অফিস
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৩ | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বড় ভাই মহিদুল ইসলামের চেয়ে দুই বছরের ছোট নাজমুল ইসলাম। কিন্তু রেলওয়ের নথিপত্রে নাজমুল এখন বড় ভাই মহিদুলের চেয়ে ১৩ বছরের বড়! জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও সার্টিফিকেটে ১৫ বছর বয়স কমিয়ে, জাল-জালিয়াতি করে রেলওয়ের চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন মহিদুল ইসলাম। দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকে দায়ের করা এক অভিযোগে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
মহিদুল ইসলাম ও নাজমুল ইসলাম যশোর সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের এড়েন্দা গ্রামের নূর আলী গাজীর ছেলে। মহিদুল খালাসি পদে রেলওয়ের বেনাপোল লোকো অ্যান্ড ক্যারেজ ডিপোতে এবং নাজমুল ক্যারেজ ফিটার গ্রেড-১ পদে চাকরি করেন।
নাজমুল ইসলাম ২০০৫ সালে রেলওয়ের চাকরিতে যোগদান করেন। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র (৫৯৯৯০৯০২৬৮) অনুযায়ী জন্ম তারিখ ১৫-১০-১৯৮৩ সালে। বাবার নাম নূর ইসলাম গাজী। ঠিকানা, এড়েন্দা, দেয়াড়া, সদর, যশোর। নাজমুলের বড় ভাই মহিদুল ইসলাম রেলওয়ের চাকরিতে যোগদান করেন ২০১৯ সালের ১০ জুলাই। রেলওয়েতে দাখিল করা কাগজপত্র অনুযায়ী, মহিদুলের জন্ম তারিখ ১২-০৫-১৯৯৬ সালে। বাবা মো. নুর গাজী, ঠিকানা-কালিয়া, নড়াইল। ভোটার নিবন্ধনের তারিখ ২০২১ সালের ১৪ জুন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নং-৪৬৬৫১৫৯৭০৫। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের দুই বছর পর নিজের নাম, বাবার নাম ও ঠিকানা বদল করে মহিদুল পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন।
আসল জাতীয় পরিচয়পত্র (৩২৯৯০৬৯২৫৬) অনুযায়ী, মহিদুলের নাম মো. মইদুল ইসলাম, বাবা-নুর আলী গাজী, জন্ম তারিখ-১০-০১-১৯৮১ সালে। ঠিকানা- এড়েন্দা, দেয়াড়া, সদর, যশোর। অর্থাৎ মহিদুলের আসল পরিচয়পত্র অনুযায়ী, নাজমুল ইসলাম তার দুই বছরের ছোট ভাই। কিন্তু নকল জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী নাজমুল এখন ১৩ বছরের বড়। এ ছাড়া মহিদুল ইসলাম যশোর সদর উপজেলার বাজেদুর্গাপুর আঞ্জুমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির যে সনদপত্র নিয়ে চাকরি করছেন, সেটিও সঠিক নয়। দুদককে এ-সংক্রান্ত একটি পত্রও দিয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক একেএম আসাদুজ্জামান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানান, মহিদুলসহ ওই সময় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রাম কর্তৃক ৮৬৩ জন খালাসি নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক চট্টগ্রাম-২ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে ২০২১ সালে মামলা দায়ের হয়। সেই মামলা এখনও চলমান রয়েছে। ওই মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে মহিদুলের স্কুলের সনদ জাল বলে নিশ্চিত করেন প্রধান শিক্ষক। কিন্তু তখন তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতির তথ্য পাওয়া যায়নি। এখন এই জালিয়াতি নিয়ে দুদক প্রধান কার্যালয়েও অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মহিদুল ইসলাম দাবি করেন, নাজমুল তাঁর বড় ভাই। কাগজপত্র জালিয়াতির অভিযোগ সঠিক নয়। চাকরির জন্য তিনি কোনো জাল-জালিয়াতি করেননি। মানুষ শত্রুতা করে এসব অভিযোগ দিচ্ছে। আর নাজমুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘মহিদুল বড় আর নাজমুল ছোট। কিন্তু নাজমুলের স্বাস্থ্য ভালো হওয়ায় বড় মনে হয়। তারা দুই ভাই রেলওয়েতে চাকরি করে জানি। কীভাবে চাকরি হলো বা তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ সেটা কিছু জানি না।’
জালিয়াতি ও অনিয়মের ব্যাপারে রেলওয়ে বিভাগ (পশ্চিমাঞ্চল) পাকশীর ডিভিশনাল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (ডিএমই) রবিউল ইসলাম জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র ও সনদপত্র জালিয়াতির কোনো অভিযোগ তিনি পাননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ওই নিয়োগ নিয়ে চট্টগ্রাম দুদকে একটি মামলা চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে দুদক যশোরের সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘তারা অভিযোগ সম্পর্কে অবগত। অভিযোগটি যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। অনুসন্ধানের অনুমতি পেলে তদন্ত শুরু হবে।’
- বিষয় :
- জালিয়াতি
- এনআইডি
- রেলপথ মন্ত্রণালয়
- দুদক
