চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ রায়হান ও ইমনের হাতে
চাঁদা না দিলে গুলি, পুলিশ পাহারায়ও রক্ষা হচ্ছে না
তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৪ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করা শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদকে দেশে ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তালিকাভুক্ত ‘দাগি অপরাধী’ সাজ্জাদের নামে ২০১২ সাল থেকে ইন্টারপোলে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি থাকলেও দেড় দশকে তার হদিস দিতে পারেনি আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।
সাম্প্রতিক সময়ে খুন, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে অতিষ্ঠ করে তোলা এই সন্ত্রাসীর নাগাল পেতে ইন্টারপোলে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করেছে পুলিশ সদরদপ্তর। সাজ্জাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে গঠন করা হয়েছে পুলিশের বিশেষ টিম। প্রায় দুই দশক ধরে আতঙ্কের নাম বড় সাজ্জাদ। খুন-খারাবিতে সিদ্ধহস্ত সাজ্জাদ বাহিনী জুলাই অভ্যুত্থানের পর আরও বেপরোয়া। দাবি করা চাঁদা না পেলে রুদ্রমূর্তি ধারণ করছেন তারা।
চট্টগ্রামে আরও একজন সাজ্জাদ আছেন। তিনি ‘ছোট সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত। ছোট সাজ্জাদই চট্টগ্রামে বড় সাজ্জাদের হয়ে সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। কার কাছ থেকে কত টাকা চাঁদা নিতে হবে, কাকে খুন করতে হবে– এসব নির্দেশনা আসে বড় সাজ্জাদের কাছ থেকে। দেশে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেন ছোট সাজ্জাদ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে এই বাহিনী সরাসরি জড়িত বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। ছোট সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারের পর আশা করা হয়েছিল, এই বাহিনীর অপরাধের মাত্রা কমে আসবে, তবে তা হয়নি। পুলিশ বলছে, ছোট সাজ্জাদ ধরা পড়ার পর এই বাহিনীর ‘কিলিং মিশনের’ দায়িত্ব পেয়েছেন দুই সাজ্জাদের বিশ্বস্ত সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ইমন। চট্টগ্রামের আলোচিত এক জামায়াত নেতার ভাগনি জামাই ইমন অনেকের কাছে ‘বুড়ির নাতি’ নামে পরিচিত। এই দুই সন্ত্রাসীকে ধরতে পারছে না পুলিশ।
টার্গেট কিলিংয়ে পারদর্শী রায়হান
র্যাব ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রায়হান টার্গেট কিলিংয়ে পারদর্শী। তার রয়েছে একটি কিলিং স্কোয়াড। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শুধু রায়হানের বিরুদ্ধে ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টিই হত্যা মামলা। সারোয়ার হোসেন বাবলা হত্যার পাশাপাশি রাউজানে যুবদলকর্মী আলমগীর ওরফে আলম হত্যারও মূল হোতা রায়হান। গত গত বছরের ৩০ মার্চ নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রাইভেটকারে থাকা বখতিয়ার হোসেন মানিক ও আব্দুল্লাহ আল রিফাত নামে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই মামলায় ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে রায়হানেরও নাম রয়েছে।
রায়হানের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান সদরে। একসময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের মিছিলে দেখা যেত তাকে। পরে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বিএনপির কর্মসূচিতে সক্রিয় হন। র্যাবের একটি সূত্র বলছে, রায়হানকে ধরতে নানামুখী চেষ্টা চলছে।
‘ঠান্ডা মাথার খুনি’ মোবারক ইমন
পুলিশ সূত্র জানায়, ছোট সাজ্জাদের আরেক সহযোগী ফটিকছড়ির কাঞ্চনগরের মোবারক হোসেন ইমন। পুলিশের খাতায় তিনি ‘ঠান্ডা মাথার খুনি’। গত বছরের ৩০ মার্চ নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোডে একটি প্রাইভেটকার গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় মানিক ও রিফাত নামে দুজন খুন হন। এ ছাড়া নগরীর পতেঙ্গায় আকবর হোসেন ওরফে ঢাকাইয়া আকবর হত্যায়ও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। ইমনের বিরুদ্ধে সাতটি হত্যাসহ এক ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে।
ইন্টারপোলের নতুন উদ্যোগ
সাজ্জাদের নামে ২০১২ সালে ইন্টারপোল রেড অ্যালার্ট জারি করেছিল। তবে তার হদিস দিতে পারছে না আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি। অপরাধের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় তাকে দেশে ফেরাতে পুলিশ সদরদপ্তরের মাধ্যমে নতুন করে তৎপরতা শুরু করে সিএমপি। তার বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য চেয়ে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিএমপির উপকমিশনার হোসাইন কবির।
সাজ্জাদ বাহিনীকে বাগে আনতে নিজের মেয়াদের শেষ দিকে বড় পদক্ষেপ নেন সদ্য বিদায়ী পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ। এ জন্য তিনি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে গঠন করেন একটি শক্তিশালী টিম। সম্প্রতি তাঁকে বদলি করা হয়েছে। হাসিব আজিজ বলেন, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের নেটওয়ার্ক নিশ্চিহ্ন করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। ১ এপ্রিল নতুন কমিশার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মো. শওকত আলীও সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছেন।
নগর পুলিশের উপকমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, ছোট সাজ্জাদ ধরা পড়ার পর রায়হান ও ইমন নামে দুজন সাজ্জাদ বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, বড় সাজ্জাদের নেতৃত্বে আলোচিত সন্ত্রাসী নুরনবী ম্যাক্সন, সরোয়ার হোসেন, আকবর আলী ও ছোট সাজ্জাদকে নিয়ে গড়ে ওঠে সংঘবদ্ধ বাহিনী। ম্যাক্সন ভারতে মারা যান, সরোয়ার দল ছেড়ে যাওয়ার পর খুন হন। বিরোধের জেরে গুলি করে হত্যা করা হয় আকবর আলীকে।
চাঁদা না দিলে বিপদ
১০ কোটি টাকা চাঁদার জন্য চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের মোবাইল ফোনে মেসেজ আসতে থাকে। বিদেশে বসে বড় সাজ্জাদ এই চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারি নগরীর চন্দনপুরায় তাঁর বাসভবন লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। এরপর সেই শিল্পপতির নিরাপত্তায় বাসভবনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যেই ফের মেসেজ আসে ওই ব্যবসায়ীর মোবাইল ফোনে। যাতে লেখা ছিল ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। এর ঠিক ২০ দিনের মাথায় ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশের উপস্থিতিতেই ফের গুলি করা হয়। চাঁদা না দেওয়ায় গত ১ আগস্ট নগরীর চান্দগাঁও মোহরা এলাকায় মোহাম্মদ ইউনুস নামে এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি করে সাজ্জাদের অনুসারীরা। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই গোপনে চাঁদা দিয়ে রক্ষা পেলেও যারা এই চাঁদা দিতে অস্বীকার করেন, তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ প্রথমে ১০ কোটি, পরে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করেছিল। চাঁদা না দেওয়ায় হুমকি দিয়ে বাসায় গুলি চালিয়েছে তার বাহিনীর সদস্যরা।
অস্ত্রের ভান্ডার
সাজ্জাদ বাহিনীকে নিয়ে কাজ করা নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই বাহিনীর হাতে রয়েছে অস্ত্রের বিশাল ভান্ডার। তাদের রয়েছে স্টেনগান, এসএমজি, রিভলবার, একে-২২ ছাড়াও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অস্ত্র। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে থানা থেকে লুট হওয়া বেশ কিছু অস্ত্রও রয়েছে তাদের হাতে।
বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অর্ধশত সন্ত্রাসী ও দক্ষ শুটার রয়েছে। বাহিনীর উল্লেখযোগ্য সদস্য হচ্ছেন– ছোট সাজ্জাদ, মো. রায়হান, মোবারক হোসেন ইমন, গলাকাটা বাচা, সাদ্দাম হোসেন, আবদুল হক, খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ।
- বিষয় :
- অপরাধ চক্র
