ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শেরপুর

খাবারের খোঁজে লোকালয়ে হাতি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

মশাল জ্বালিয়ে, পটকা ফুটিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন কৃষক

খাবারের খোঁজে লোকালয়ে হাতি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক
×

ছবি : সমকাল

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৫:১৫

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় গারো পাহাড়ে হাতি ও মানুষের সংঘাত থামছেই না। জঙ্গলে খাবার না পেয়ে প্রতিনিয়ত লোকালয়ে এসে ফসলে হানা দিচ্ছে হাতির পাল। নষ্ট হচ্ছে ধান ও ভুট্টা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। হাতি প্রতিরোধে মশাল জ্বালিয়ে, পটকা ফুটিয়ে নির্ঘুম রাত পার করছেন তারা। কিন্তু এতেও কাজ হচ্ছে না।

জানা গেছে, গত পাঁচ দিন ধরে কাংশা ইউনিয়নের রাংটিয়া রেঞ্জের বড় গজনী, ছোট গজনী, বাকাকুড়া গান্ধীগাঁও, তাওয়াকুচাসহ কয়েকটি গ্রামে একপাল হাতি রাতে ফসলের মাঠে হানা দিচ্ছে। রাতেও লোকালয়ে বিচরণ করছে। হাতির পাল ফসল খেয়ে কৃষকের ক্ষতি করছে। হাতির পেটে গেছে প্রায় ৫০ একর জমির ধান ও ভুট্টা। হাতি ও মানুষের মধ্যে এ লড়াই ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে চলছে।

শেরপুর বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন সরকার বলেন, ‘হাতি-মানুষ দ্বন্দ্বে ময়মনসিংহ বিভাগের গারো পাহাড়ে (ঝিনাইগাত, শ্রীবরদী, নালিতাবাড়ী, বকশীগঞ্জ ও হালুয়াঘাট) গত দুই দশকের বেশি সময়ে অন্তত ৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছে ৩৫টি হাতি।’

জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে হাতির পাল রাংটিয়া-গজনী-বালিঝুরি সীমান্তে সড়কে অবস্থান নেয়। এরপর বন বিভাগ লোকজনকে ওই সড়ক দিয়ে চলাচল না করতে নির্দেশনা দিয়েছে। 

কৃষকরা বলছেন, জ্বালানি তেল সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তাদের বিপদ আরও বেড়েছে। পাহাড়ি গ্রামগুলোতে গত কয়েক দিন ধরে রাতে বিদ্যুৎ থাকে না। মিলছে না পর্যাপ্ত ডিজেল ও কেরোসিন। এতে মশাল জ্বালাতে পারছে না কৃষক ও এলিফেন্ট রেসপন্স টিম। সীমিত আকারে মশাল জ্বালিয়ে তারা চেষ্টা করছে হাতি ঠেকাতে। কিন্তু যতক্ষণ আলো জ্বলে, ততক্ষণ নিয়ন্ত্রণে থাকে হাতি। আলো নিভলেই হানা দেয়।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ৪০ থেকে ৫০ হাতির একটি দল পাঁচ-ছয় দিন ধরে বড় গজনী, ছোট গজনী, বাকাকুড়া গান্ধীগাঁও ও তাওয়াকুচা এলাকায় বিচরণ করছে। বাকাকুড়া গ্রামের কৃষক জহুরুল মিয়া বলেন, গত কয়েক দিন রাতের আঁধারে উন্মত্ত হাতির পাল ধানক্ষেতে হানা দিচ্ছে। এলাকার প্রায় ২০-২৫ কৃষকের ধান, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল খেয়ে ও পায়ে পিষ্ট করে নষ্ট করেছে।

উত্তর গান্ধীগাঁও গ্রামের বাসিন্দারা কদিন ধরে হাতির আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। কৃষক নাজিমুদ্দিন বলেন, এলাকার কৃষকরা এখন দিনে ঘুমান, রাতে ক্ষেত পাহারা দেন। গত কয়েক দিনে ঢাকঢোল পিটিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাতি প্রতিরোধের চেষ্টা করছি।

শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সভাপতি সুজয় মালাকার জয় বলেন, বনের জমি দখল করে ফসলের আবাদ করছেন কৃষকরা। এতে হাতির প্রাকৃতিক খাবারের সংকট দেখা দিচ্ছে। বনকলা থেকে শুরু করে নানা ফলের গাছ এবং বনের ভেতরের বাঁশের ঝাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া ঝোপঝাড় পুড়িয়ে ফেলায় হাতি খাবার পাচ্ছে না। এসব কারণে বাধ্য হয়ে ধান খাচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল যেসব উদ্ভিদ থাকে, তা থেকে হাতি খাবার পায়। সেসব এখন নেই। হাতির আবাসস্থলেই কাছাকাছি, এমনকি আবাসস্থলের ভেতরেই টিলার ওপরে ফসল আবাদ হচ্ছে। আবাসের ভেতরে যদি এভাবে আবাদ হয়, তাহলে তো হাতি সেগুলো খাওয়ার জন্য যাবেই। খাবারের পাশাপাশি হাতির জন্য পানিও আবশ্যকীয়। আগে যেসব ডোবা-নালা ছিল, সেখান থেকে সে পানি পান করত, গোসল করত। ওই জায়গাগুলোতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। হাতি নামলে মাছ মারা যায়। তাই চাষিরা হাতিকে পানিতে নামতে দেন না। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে সংঘাত হবেই।

বন বিভাগের রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, ক্ষয়ক্ষতি অনেক হয়েছে। তবে কত একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, তা নির্ধারণ করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আবেদন করতে বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষে থেকে কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল আমীন বলেন, কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×