ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বরাদ্দ চাল মেলেনি ১০ দিনেও

বরাদ্দ চাল মেলেনি ১০ দিনেও
×

সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলছে। জেলে নৌকা ও ট্রলার বেঁধে রাখা হয়েছে উপকূলে। তীরেই শুকাতে দেওয়া হয়েছে জাল। শুক্রবার সোনাগাজীর চর খোন্দকার জেলেপাড়ায় সমকাল

সোনাগাজী (ফেনী) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০০ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুই ছেলেকে নিয়ে উপকূলীয় এলাকার নদী ও সাগরে মাছ শিকার করে পরিবারের খরচ চালাতে হয় হারাধন জলদাসের। তাঁর ছয় সদস্যের সংসারে দিনে চালই লাগে তিন কেজির বেশি। ১৫ এপ্রিল বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর বিপাকে পড়েন ফেনীর সোনাগাজী সদরের এই জেলে। তালিকাভুক্ত হলেও তাঁর কাছে সরকারি সহায়তার চাল এখনও পৌঁছায়নি। 
শুক্রবার হারাধন জলদাসকে পাওয়া যায় সদর ইউনিয়নের চর খোন্দকার জেলেপাড়ায়। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার আগে মাছ ধরে বিক্রি করতেন মহাজন ও আড়তদারের কাছে। এতে দিনে দুই-তিন হাজার টাকা আয় হতো। ইঞ্জিনচালিত নৌকার তেল খরচ বাদে বাকি টাকা সংসারে দিতেন।

হারাধন জলদাসের ভাষ্য, ভূমিদস্যুরা নদী দখল করে বড় বড় মাছের খামার গড়ে তুলেছে। যে কারণে এমনিতেই নদীতে মাছ কমে গেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে সমুদ্রে মাছ শিকার করতেও যেতে পারছেন না। ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও সরকারি চাল পাননি। যে কারণে বাধ্য হয়ে বড় ফেনী নদীতীরে মশারি জাল দিয়ে চিংড়ি পোনা ধরছেন। এতে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালাচ্ছেন। 
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন সোনাগাজী সদর ইউনিয়নের কয়েকশ জেলে পরিবারের সদস্যরা। যদিও এ ইউনিয়নের ১৫০ পরিবার শিগগির সহায়তার চাল পাবেন– এমন আশ্বাস দিয়েছেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। অন্য পরিবারগুলোকে ১১ জুন পর্যন্ত জীবন ধারণে করতে হবে ধারদেনা।

সোনাগাজী মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, উপজেলার চর দরবেশ, চর চান্দিয়া, সোনাগাজী সদর ও আমিরাবাদ ইউনিয়নে নিবন্ধিত জেলে এক হাজার ৯৯৭ জন। এর মধ্যে কার্ডধারী জেলে প্রায় এক হাজার ৫০০। ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের বংশবিস্তার এবং সংরক্ষণের লক্ষ্যে যে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে, এই সময়ে তাদের মধ্যে মাত্র ২৭৫ জেলে পরিবার ৮০ কেজি করে চাল পাবে। অন্যরা থেকে যাবে এই সুবিধার বাইরে।

নিবন্ধিত কয়েকজন জেলের ভাষ্য, সোনাগাজীতে জেলের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। তবে সরকার নিবন্ধিত করেছে প্রায় দুই হাজার জেলেকে। মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের ছয় ভাগের এক ভাগ সরকারি সহায়তা পান। অন্যরা এই সহায়তা না পেয়ে সংসারের প্রয়োজনে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে চক্রবৃদ্ধি হারে।
শুক্রবার সরেজমিন উপজেলার চর খোন্দকার, দক্ষিণ-পূর্ব চর চান্দিয়া ও পূর্ব চর চান্দিয়া 

এলাকার জেলেপাড়ায় যান এই প্রতিবেদক। সহায়তা না পাওয়া জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অনেক কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাদের। অনেক জেলে স্বীকার করেন, পেটের দায়ে রাতে তারা নৌকা-ট্রলার নিয়ে নদী ও সমুদ্রে যান। মাছ শিকার করে সূর্য উঠার আগেই তীরে ফেরেন। এসব মাছ আড়তদার ও ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করতে হয় সস্তায়।
চর খোন্দকার জেলেপাড়ার সর্দার প্রিয়লাল জলদাসের ভাষ্য, তাঁর পরিবারে সদস্য চারজন। তাদের দিনে চাল লাগে প্রায় দুই কেজি। মাছ ধরে নিজেই বিক্রি করেন বলে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে দৈনিক ৪-৫ হাজার টাকা আয় করতেন। এখন পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। প্রিয়লাল জলদাস বলেন, নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ। অনেক কষ্টে জীবিকা চলছে। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের খাবার জোগান দিতে বিভিন্ন সড়কের পাশে জলাশয় ও পুকুর থেকে মাছ ধরে বিক্রি করছেন। অনেক জেলে মহাজন ছাড়াও নানা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। মাছ ধরতে না পারায় এসব পরিশোধ করতে পারছেন না।
সদর ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক নাহিদুল হাসান বলেন, তাঁর ইউনিয়নের ১৫০ জেলের জন্য সরকারিভাবে চাল বরাদ্দ হয়েছে। এসব চাল পাওয়ামাত্রই জেলেদের মধ্যে বিতরণ করবেন।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার পাল বলেন, সোনাগাজীতে নিবন্ধিত প্রায় দুই হাজার জেলে পরিবার থাকলেও সমুদ্রগামী জেলের সংখ্যা কম। তাই যাচাই-বাছাই করে চর চান্দিয়া ইউনিয়নে ১০০ পরিবার, সদর ইউনিয়নে ১৫০ পরিবার ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের ২৫ পরিবারকে সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। এই ২৭৫ পরিবার মাছ ধরা বন্ধের ৫৮ দিনের জন্য ৮০ কেজি করে চাল পাবেন। দু-এক দিনের মধ্যেই এই চাল বিতরণ করা হবে। অন্য জেলেদের জন্য সহায়তা চেয়ে অধিদপ্তরে আবেদন পাঠানো হয়েছে। সহায়তা এলে তারাও পাবেন।

আরও পড়ুন

×