ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

থমকে আছে হারভেস্টার বন্ধ বাগানের চা উৎপাদন

থমকে আছে হারভেস্টার বন্ধ বাগানের চা উৎপাদন
×

মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাধবপুর উপজেলায় তীব্র ডিজেল সংকটের মুখে পড়েছেন হারভেস্টারে ফসল কাটার অপেক্ষায় থাকা কৃষকরা। এদিকে চলমান বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে চা বাগানের কারখানাগুলোতে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
জ্বালানি তেলের সংকটে বোরো ধান কাটার মৌসুমে মাধবপুরের বিভিন্ন এলাকার হারভেস্টার মেশিনগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সময়মতো ধান কাটতে না পারায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। বিশেষ করে, যেসব কৃষক আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষতির আশঙ্কা আরও বেশি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে মাধবপুরের বিভিন্ন হাওর ও নিচু জমিতে ধান পেকে গেছে। এই সময়ে দ্রুত ধান কাটার জন্য হারভেস্টার মেশিন সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ মেশিনই এখন বন্ধ রয়েছে। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে আবার শ্রমিকনির্ভর পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছেন, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
উপজেলার একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের দুর্ভোগের কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বোরো চাষি জানান, তারা ভেবেছিলেন, এবার মেশিন দিয়ে দ্রুত ধান কেটে ফেলবেন। জ্বালানি পরিস্থিতি সে পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে। ডিজেল নেই বাজারে। যেটুকু পাওয়া যায়, দাম এত বেশি যে হারভেস্টার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। এখন শ্রমিক খুঁজতে গিয়ে সেটাও মিলছে না।
মাধবপুরের আরেক কৃষক বলেন, ধান পেকে জমিতে পড়ে আছে। সময়মতো কাটতে না পারলে ঝড়ে বা বৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আগে হারভেস্টার থাকায় এই ভয়টা কম ছিল, কিন্তু এখন আবার সেই পুরোনো সমস্যায় পড়েছেন।

এদিকে হারভেস্টার মেশিন মালিকদের অবস্থাও খুব একটা ভালো না। শাহেদ মিয়া নামে এক মেশিন মালিক জানান, একটা মেশিন চালাতে দিনে প্রচুর ডিজেল লাগে। আগে সহজেই ডিজেল পাওয়া যেত, এখন খুঁজতে হয়। অনেক সময় পাম্পে গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। ফলে মেশিন থাকলেও কাজ করা যাচ্ছে।
জ্বালানি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ কেউ বলছেন, স্থানীয় বাজার ও ফিলিং স্টেশনে ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় কৃষি কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজেল সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ধান কাটা নয়, সেচ কার্যক্রমেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এতে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলার এক প্রবীণ কৃষক বলেন, এখন সময়মতো ধান কাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে ডিজেল নেই, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট। সরকার যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে কৃষকদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

কৃষি বিভাগের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব সরকার বলেন, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা দ্রুত সমাধান চান। তাদের দাবি, ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা। সেটা করা গেলে বিপর্যয় ঠেকানো যেতে পারে। সমস্যা সমাধানে কৃষকদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ডিজেল দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
এদিকে অসহনীয় বিদ্যুৎবিভ্রাটে চরম সংকটে পড়েছে মাধবপুরের চা বাগানগুলো। এ অঞ্চলের পাঁচটি বড় চা বাগানসহ মোট ২৩টি বাগানে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাগান মালিক ও শ্রমিকরা পড়েছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে। দীর্ঘস্থায়ী এ-সংকট চা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মাধবপুরে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। যা দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত ভোগান্তি দিচ্ছে। আবার অনেক সময় এর চেয়েও লম্বা সময় ধরে বন্ধ থাকছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। এতে চা পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাগানের কারখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, গাছ থেকে সংগ্রহ করা পাতা শুকানো, রোলিং এবং ফাইনাল ড্রায়িংয়ের কাজ সঠিকভাবে করা না গেলে চায়ের মান নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে যা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কাঁচা চা পাতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক বাগান কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে কাঁচা পাতা ফেলে দিচ্ছেন, এতে প্রতিদিন লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
জগদীশপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক মনির হোসেন বলেন, চা উৎপাদন পুরোপুরি সময় নির্ভর করে একটি প্রক্রিয়ার ওপর। নির্দিষ্ট সময়ে পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলে তার মান নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় মাঝপথে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। জেনারেটর বিকল্প হলেও ডিজেলের চড়া দামের কারণে সেটিও নিয়মিত ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে চা শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রতিদিনই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাগানগুলো। সরকার যদি দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করে, তাহলে এই খাত ব্যাপক সংকটে পড়বে।

বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের ম্যানেজার শামসুল হক ভূঁইয়া বলেন, চা শিল্প একটি শ্রমনির্ভর খাত এবং এর প্রতিটি ধাপ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে যায়।
তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার দেওয়ান বাহাউদ্দিন লিটন বলেন, চা শিল্প টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে কিন্তু বাজারে চায়ের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। এর মধ্যে আবার দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে, যা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি চা বাগান পরিচালনা করতে প্রতিদিন বিশাল ব্যয় হয়। উৎপাদন কমে গেলে সেই ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রুত বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে চা শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

আরও পড়ুন

×