উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ রাজশাহী সিটি হাট
ইজারায় ১৪ কোটির হাট ৮ কোটিতে
রাজশাহী সিটি করপোরেশন ভবন
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ রাজশাহী সিটি হাট গত বছর ইজারা দেওয়া হয়েছিল ১৪ কোটি টাকায়। এবার মাত্র ৮ কোটি টাকায় হাটটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) ইজারা কমিটি রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে হাটটি প্রায় অর্ধেক দামে ইজারা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি সিন্ডিকেটের কারণে এবার হাটটি ইজারা দিয়ে ৬ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে সিটি করপোরেশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজশাহী সিটি হাট ইজারা সিন্ডিকেটে নেতৃত্বে দিয়েছেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির এক নেতা। হাটটি ইজারা দিয়ে সিটি করপোরেশন বিপুল রাজস্ব হারালেও সিন্ডিকেটটি সাড়ে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
হাটটি ইজারা নিতে সিডিউল (দরপত্র) সংগ্রহ করা কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিন্ডিকেটের কাছে রাসিকের হাট ইজারা কমিটি অসহায়। আগ্রহী অনেক ব্যবসায়ী দরপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের কাছে সিডিউল জমা দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের হাটের ইজারার শেয়ার দেওয়ার কথা বলে দরপত্র জমা নেওয়া হয়েছিল। এখন ইজারার শেয়ারও দিচ্ছেন না, আবার নেগোসিয়েশনের টাকার ভাগও দিচ্ছেন না সিন্ডিকেটের হোতারা।
জানা গেছে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর সিটি হাটসহ ১৪টি হাটবাজার বার্ষিক মেয়াদে ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করে রাসিকের ইজারা কমিটি। গত ১২ মার্চ ছিল প্রথম দফায় সিটি হাট ইজারায় দরপত্র দাখিলের শেষ দিন। প্রথম দফায় ১৮টি দরপত্র বিক্রি হলেও হাট সিন্ডিকেট চাপ প্রয়োগ করে অধিকাংশ দরপত্র নিজেদের হাতে জমা নিয়ে নেন। ফলে শেষ দিনে মাত্র ৫টি দরপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে গত বছরের ইজারাদার মেসার্স শওকত আলীর দেওয়া ৭ কোটি ৮০ হাজার টাকা দরটি সর্বোচ্চ বিবেচিত হয়। তবে গত বছরের চেয়ে ইজারা মূল্য ৭ কোটি টাকা কম হওয়ায় ইজারা কমিটি দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করেন। কিন্তু তাতেও রক্ষা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিটি হাট দ্বিতীয় দফা দরপত্র দাখিলের শেষ দিন ছিল গত ৮ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফায় ২৫টি দরপত্র বিক্রি হয়। দ্বিতীয় দফাতেও সিন্ডিকেট ৪টি বাদ দিয়ে বাকি ২১টি দরপত্র দাতাকে চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছে জমা দিতে বাধ্য করে। প্রথম দফায় সর্বোচ্চ দরদাতা মেসার্স শওকত আলী দ্বিতীয় দফাতে সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৭ লাখ টাকা দর দাখিল করেন। ইজারা কমিটি শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মেসার্স শওকত আলীকে এক বছরের জন্য সিটি হাট ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন।
হাটটি ইজারা পেতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সিন্ডিকেটের হোতা বিএনপি নেতা তাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাদের কাছে দরপত্র জমা দিলে তাদের প্রাপ্ত অর্থ থেকে ভাগ অথবা কম দামে হাটের শেয়ার দেওয়া হবে। তারা কিছুই দেয়নি।
দরপত্র উত্তোলনকারী ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল শেয়ার দেওয়া হবে। এ কারণে আমরা সিন্ডিকেটের কাছে সিডিউল জমা দিয়েছিলাম। পরে আমাদের কিছুই দেওয়া হচ্ছে না।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী বারিক হোসেন বলেন, ‘আমাদের সিডিউল দাখিল করতে দেওয়া হলে আমরা সিটি হাট আরও বেশি দামে নিতে পারতাম। এতে সিটি করপোরেশনকে ৬ কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে হতো না।’
সিটি হাটের ইজারা পাওয়া ব্যবসায়ী শওকত আলী বলেন, ‘প্রথমবারও আমি সর্বোচ্চ দর দিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বারেও সর্বোচ্চ দরদাতা
হয়েছি। ফলে সিটি করপোরেশনের ইজারা কমিটি আমাকে এক বছরের জন্য কার্যাদেশ দিয়েছে। আমরা হাট পরিচালনা করছি।’ ২৫টি সিডিউল উঠলেও শেষদিনে মাত্র ৪টি দরপত্র জমা পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কেউ জমা না দিলে আমার কী বলার থাকতে পারে।’ সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে শওকত আলী বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেটের বিষয় আমার জানা নাই।’
গত বছরের তুলনায় সিটিহাট ইজারায় ৬ কোটি টাকা রাজস্ব কম আসার কারণ জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ইজারা কমিটির সদস্য সচিব সোহেল রানা জানান, প্রথম দফায় সর্বোচ্চ দর প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় দফায় সর্বোচ্চ দরদাতাকে হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। কম টাকায় সিন্ডিকেটের কাছে হাট দেওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। এ বিষয়ে জানতে সিটি করপোরেশনের সিইও রেজাউল করিমকে ফোন দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সিটি করপোরেশনের সিইও রেজাউল করিম বলেন, ‘সরকারি নীতিমালা মেনেই টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত নই। টেন্ডার দাখিলের পর মূল্যায়ন হয়েছে, সে অনুযায়ী নীতিমালা মেনে (ইজারাদার নিয়োগ) দেওয়া হয়েছে। এটা একক কারও সিদ্ধান্তে হয়নি।’
