শিমরাইল ট্রাক টার্মিনাল
নৈশপ্রহরীদের বেতনের নামে চাঁদা উঠছে লাখ লাখ টাকা
সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বহুল আলোচিত ৭ খুন মামলার প্রধান আসামি ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নূর হোসেনের অন্যতম ঘাঁটি ছিল শিমরাইল ট্রাক টার্মিনাল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ টার্মিনালের কর্তা এখন ‘জাতীয়তাবাদী জিয়া সৈনিক দল’ নামের ভূঁইফোড় সংগঠনের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির আহ্বায়ক জিএম সুমন মুন্সী। নিজের কোনো গাড়ি না থাকলেও তিনি এখন বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ মালিক সমিতি শিমরাইল শাখার সভাপতি। পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের অভিযোগ, সুমন মুন্সীর ছত্রছায়ায় টার্মিনাল থেকে মাসে তোলা হচ্ছে লাখ লাখ টাকার চাঁদা।
টার্মিনালে চারপাশে সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানপাট, বিভিন্ন পরিবহনের টিকিট কাউন্টার ও টার্মিনালে পার্কিং করা ট্রাক থেকে এ চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। একটি সূত্র জানায়, গাড়ি ও দোকানপাট থেকে যে চাঁদা তোলা হয় তা থেকে নৈশপ্রহরীদের বেতন দিয়ে বাকি টাকা শ্রমিকদল নেতা হাবিবুর রহমান হাবিবের মাধ্যমে সুমন মুন্সীর কাছে যায়।
জিএম সুমন মুন্সীর পক্ষে টার্মিনালের নৈশপ্রহরী আব্দুল হালিম চাঁদা তোলেন। প্রতি গাড়ি থেকে দৈনিক ৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয় বলে স্বীকার করেন তিনি। এ হিসেবে ট্রাক থেকে মাসে চাঁদা আদায় হয় দেড় লক্ষাধিক আর দোকানপাট থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা। নৈশপ্রহরীদের বেতন মাসে ১৫ হাজার টাকা। আব্দুল হালিম ৬ জন নৈশপ্রহরী থাকার কথা জানালেও তিন জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, বাকি ৩ জনের খোঁজ মেলেনি। আব্দুল হালিমের কথামতো ১৫ হাজার টাকা করে ৬ জন নৈশপ্রহরীর বেতন বাবদ মাসে ব্যয় হয় ৯০ হাজার টাকা। অথচ চাঁদা উঠছে তিন লাখ টাকার বেশি।
জানা যায়, নৈশপ্রহরীরা বেতনাদি নিয়ে দৈনিক চার হাজার টাকা হাবিবুর রহমান হাবিবের কাছে জমা দেন। টার্মিনালের দোকানপাট থেকে টাকা তোলেন আবুল কাশেম ও আব্দুল মজিদ। তারাও টাকা হাবিবের কাছে জমা দেন। টার্মিনালের দোকানপাট থেকে টাকা উত্তোলনকারী আবুল কাশেম বলেন, অনেক দোকানদার ঠিকমতো টাকা দেয় না। আব্দুল মজিদের কাছে কত টাকা তোলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সাথে লোকজন আছে। পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন।
হাবিবুর রহমান হাবিব শ্রমিকদলের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নং ওয়ার্ডের আহবায়ক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আহবায়ক এসএম আসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেচেন। এছাড়া তিনি শিমরাইল আন্তঃজেলা ট্রাক চালক ইউনিয়নের সদস্য বলে জানা গেছে।
শ্রমিকদল নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, চলতি এপ্রিল মাস থেকে আমাকে টাকা আদায়ের হিসাব রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মাস শেষে বলতে পারব কত টাকা টার্মিনাল থেকে আসে। টার্মিনাল খানাখন্দে বেহাল হয়ে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খানাখন্দে আমরা বিল্ডিং ভাঙ্গা রাবিশ ফেলব কিন্তু বৃষ্টির কারণে পারিনি।
দেশের পটপরিবর্তনের পর টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী মুন্সী। তিনি সুমন মুন্সীর আপন চাচা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই আইয়ুব আলীকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর স্বেচ্ছায় টার্মিনাল থেকে তিনি সরে যান। টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তার ভাতিজা সুমন মুন্সীর হাতে। নিজের কোনো গাড়ি না থাকলেও সুমন মুন্সী হয়ে যান সমিতির সভাপতি।
কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতি শিমরাইল শাখার সভাপতি জিএম সুমন মুন্সী বলেন, টার্মিনালে কোনো চাঁদা আদায় করা হয় না, তবে নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য ৫০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এতে মাসে কত টাকা আদায় হয় তা আমি জানি না। তিনি আরও বলেন, প্রতি মাসে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সংগঠন চালাচ্ছি। চলতি মাসে শ্রমিকদল নেতা হাবিবকে দায়িত্ব দিয়েছি, মাস শেষে বলতে পারব কত টাকা ওঠে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক মামুন মাহমুদ বলেন বিএনপির গঠনতন্ত্র মোতাবেক জিয়া সৈনিক দল নামের কোনো সংগঠন নেই। ট্রাক টার্মিনালের কী হচ্ছে তা তিনি অবগত নন বলে জানান। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি এমদাদুল হক বলেন, টার্মিনালে চাঁদা আদায়ের বিষয়ে আমার জানা নেই।
- বিষয় :
- চাঁদা
