শতবর্ষী রেললাইন এখন ‘মৃত্যুর করিডোর’
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত প্রায় ৪৩ কিলোমিটার রেললাইন। শতবর্ষী এই রেলপথ এখন শুধু যাতায়াতের পথ নয়, যেন এক নীরব মৃত্যুকূপ। একের পর এক মরদেহ মিলছে রেললাইনে, অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হচ্ছে না ময়নাতদন্ত। ফলে দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড–সেই প্রশ্নের উত্তর চাপা পড়ছে ‘অপমৃত্যু’ মামলার ফাইলেই।
১৯১৫ সালে স্থাপিত এই সিঙ্গেল লাইন দিয়ে আজও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে রাজশাহীর রেলযোগাযোগ বজায় রয়েছে। শত বছরের পুরোনো এই রেলপথ এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, স্থানীয়দের কাছে ধীরে ধীরে এটি পরিণত হয়েছে ‘মৃত্যুর করিডোরে’।
প্রতিদিন এই লাইনে বনলতা, সিল্কসিটি, ধূমকেতু, পদ্মা, কপোতাক্ষ, সাগরদাঁড়ি, তিতুমীর, বরেন্দ্র, বাংলাবান্ধাসহ অন্তত ১৫টি ট্রেন ৩০ বার যাতায়াত করে। এর সঙ্গে রয়েছে লোকাল ও মালবাহী ট্রেন। ব্যস্ত এই রুটে প্রায়ই মিলছে লাশ।
ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই লাইনে ২৬টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯-এ। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই উদ্ধার হয়েছে ১৭টি মরদেহ। অর্থাৎ গড়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একটি করে মৃত্যু ঘটছে এই রেলপথে।
ময়নাতদন্ত না হওয়ায় সত্য চাপা পড়ে
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ ঘটনায় থানায় শুধু অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়। পরিবারের আবেদনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। এতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অন্ধকারেই থেকে যায়।
গত ২১ এপ্রিল গভীর রাতে চারঘাটের কালাবিপাড়া এলাকায় ট্রেনে কাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সোহাগ আলী (২৬) নামে এক যুবকের মরদেহ। তাঁর দুই পা বিচ্ছিন্ন ছিল। নিহতের বাবা জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার ছেলে কিছু মাদকসেবীর সঙ্গে চলাফেরা করত। আমাদের সন্দেহ, তাকে হত্যা করে রেললাইনে ফেলে রাখা হয়েছে। কিন্তু ঝামেলা বাড়বে ভেবে মামলা করিনি, ময়নাতদন্তও হয়নি।’
একই ধরনের ঘটনা ঘটে গত বছর আড়ানী রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশে। সেখান থেকে উদ্ধার হয় মাহফুজুর রহমান মিশনের (২৫) মরদেহ। তাঁর মা মুল্লিকা বেওয়া বলেন, ‘রাতে ফোন করে বলেছিল, কে বা কারা তাকে চোখ-মুখ বেঁধে রেখেছে। আমাকে বাঁচাতে বলেই ফোন কেটে যায়। পরে শুনি, রেললাইন থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।’ অথচ সেই ঘটনাতেও হত্যা মামলা হয়নি।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘অনেক মরদেহের অবস্থা দেখলে সন্দেহ হয়। কিন্তু তদন্ত বা ময়নাতদন্ত না হওয়ায় সত্য আর সামনে আসে না।’
আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড?
স্থানীয়দের ধারণা, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, ঋণের চাপ, প্রেমঘটিত সমস্যা কিংবা মানসিক অবসাদে অনেকে আত্মহত্যার পথ হিসেবে রেললাইন বেছে নিচ্ছেন। আবার অপরাধীরা হত্যার পর মরদেহ রেললাইনে ফেলে রাখছে কিনা, সেই প্রশ্নও উঠছে।
গত ২২ এপ্রিল হলিদাগাছী এলাকায় ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন মুংলি গ্রামের জাম্মান আলীর স্ত্রী লাকি বেগম (৫০)। স্থানীয়রা জানান, পারিবারিক কলহে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। আত্মহত্যার আগে প্রায় এক ঘণ্টা রেললাইনের আশপাশে ঘুরছিলেন।
এরও আগে, গত বছরের ১৪ এপ্রিল ঋণের চাপে আত্মহত্যা করেন পেঁয়াজচাষি রুহুল আমিন। আড়ানী স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ধূমকেতু এক্সপ্রেস আসতেই ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন তিনি। সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়।
রাজশাহী জেলা জজকোর্টের আইনজীবী রাকিব সরকার বলেন, ‘প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত জরুরি। কারণ ট্রেনে কাটা পড়ার আড়ালে হত্যা কিংবা অন্য অপরাধও লুকিয়ে থাকতে পারে।’
ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ কিলোমিটার, বাড়ছে আতঙ্ক
সরদহ স্টেশন থেকে আড়ানী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ সংশ্লিষ্টরা। এখানে রয়েছে অবৈধ পারাপারের পথ, জনবল সংকটে বন্ধ প্রায় স্টেশন এবং অরক্ষিত রেল ক্রসিং। গত ২২ ও ২৩ এপ্রিল মাত্র দুই দিনেই এই অংশ থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, ‘নন্দনগাছী স্টেশন এক যুগ ধরে বন্ধ। আড়ানী ও সরদহ স্টেশনেও জনবল কম। এই সুযোগে রেললাইন ঘিরে অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে।’
হলিদাগাছী এলাকার বাসিন্দা মখলেসুর রহমান বলেন, ‘অনেক স্থানে অবৈধ রাস্তা তৈরি হয়েছে, কিন্তু রেলগেট নেই। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।’
ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানার ওসি জিয়াউর রহমান বলেন, ‘পরিবারের আবেদনের কারণে অনেক সময় ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে রেললাইনে অপরাধ দমনে আমরা কাজ করছি।’
বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
- বিষয় :
- রেললাইন
