প্রকৃতি
সোনালু-জারুলে সেজেছে রাজশাহী
রাজশাহী নগরীর সড়কের দুই ধারে ফুটেছে সোনালু ফুল। সম্প্রতি তোলা- সমকাল
সৌরভ হাবিব, রাজশাহী
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ০৯:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের আগুনঝরা দুপুর। তপ্ত রোদে যখন পিচঢালা পথ থেকে আগুনের হলকা বের হয়, ঠিক তখন রাজশাহী নিজেকে মেলে ধরে ভিন্ন এক রূপে। উত্তরবঙ্গের এই বিভাগীয় শহরটির তপ্ত বাতাসে এখন কেবল খরার ভয় নয়, বরং মিশে আছে সোনালুর হলুদ আভা আর জারুলের বেগুনি স্নিগ্ধতা। কংক্রিটের নাগরিক ব্যস্ততায় চোখের শান্তি আর মনের স্বস্তি হয়ে ফুটেছে হাজারো ফুল।
রাজশাহী শহরের পরিচ্ছন্নতা আর সৌন্দর্যের খ্যাতি দেশজুড়েই। তবে বর্তমানের এই রূপ যেন আগের সব আয়োজনকে ছাপিয়ে গেছে। গ্রীষ্মের তাপদাহ যখন জনজীবন ওষ্ঠাগত করে তোলে, তখন প্রশান্তির পরশ দিচ্ছে সড়কের দুই ধারের অজস্র ফুল। বিশেষ করে নগরীর বিমান চত্বর এলাকার দুই পাশে সারি সারি সোনালু গাছের হলুদ আভা আকাশপানে চেয়ে থাকে। দেখে মনে হয়, যেন প্রকৃতি তার সবটুকু স্বর্ণালি রং ঢেলে দিয়েছে এই রাজপথের ধারে।
নগরীর কল্পনা সিনেমা হলের মোড় থেকে তালাইমারী, বহরমপুর সিটি বাইপাস কিংবা হাইটেক পার্কসংলগ্ন সড়ক– সবখানেই এখন ফুলের উপস্থিতি। সড়ক বিভাজকের মাঝে ফুটে থাকা টকটকে লাল রক্তকরবী পথচারীদের নিমেষেই ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। শুধু সোনালু বা করবী নয়; কৃষ্ণচূড়া, জারুল, সাদা ও লাল জবা, চন্দ্রপ্রভা, সাদা কাঞ্চন, মাধবীলতা, গৌরীচূড়া, বকুল আর বাগানবিলাসের বৈচিত্র্যে শহরটি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। একটি ফুলের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই অন্যটি ফুটে উঠছে, ফলে সারাবছরই শহর থাকছে বর্ণিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ক্যাম্পাস এখন রঙের সবচেয়ে প্রাণবন্ত কেন্দ্র। জারুলের বেগুনি আভা ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি করেছে এক নির্মল আবহ। পশ্চিমপাড়ার হল এলাকা, কাজলা গেট ও চারুকলা এলাকায় সারি সারি সোনালু ও কাঞ্চন গাছ মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাস যেন এক স্বর্গীয় উদ্যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিতু বলেন, ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের নিয়ে এই ফুলগাছের নিচে সময় কাটালে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। দিন শেষে বন্ধুদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরি, ফুল দেখি, ছবি তুলি। অনেক দর্শনার্থীও আসে এই সৌন্দর্য দেখতে।
শহরের সাধারণ মানুষের কাছে এই ফুলগুলো কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং প্রচণ্ড গরমে এক চিলতে স্বস্তি। বিকেলে বা সন্ধ্যায় সোনালু ও জারুলতলায় আড্ডা জমানো এখন নগরবাসীর নিত্যদিনের চিত্র। পথচারী আসিফ ইকবালের মতে, শহরে বিনোদন কেন্দ্রের অভাব থাকলেও পুরো শহরটাই এখন যেন একটা পর্যটনকেন্দ্র। ফুলের এই সমারোহ এখন আমাদের জীবনের অংশ।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ স্থায়ী প্রজাতির বনজ, ভেষজ ও শোভাবর্ধক গাছ লাগানো হয়েছে। এ ছাড়া ১০ লক্ষাধিক বেড়া-জাতীয় ফুলের গাছ শহরের ৩৪ কিলোমিটার সড়ক বিভাজকজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এসব ফুলের পরিচর্যায় নিয়োজিত রয়েছেন ৭৬ জন কর্মী। প্রতিদিন ট্রাকে করে পানি দেওয়া এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের কারণেই ফুলগুলো সতেজ থাকছে। আবার শহরের বাসিন্দারাও সচেতন। তারা নিজ উদ্যোগে এসব ফুল ও গাছের যত্ন নেন, কেউ ফুল ছিঁড়ে সৌন্দর্য নষ্ট করেন না।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, নগরীর সৌন্দর্য ও পরিবেশ উন্নয়নে আমরা নিরলস কাজ করছি। রাজশাহীর এই সবুজ ও ফুলেল ঐতিহ্য ধরে রাখতে আরও আড়াই লাখ গাছ লাগানোর প্রস্তুতি চলছে। আমাদের লক্ষ্য, প্রতিটি ঋতুতেই যেন শহরটি ফুলে ফুলে সুশোভিত থাকে।
রাজকীয় মুকুট বাতি আর প্রজাপতি আলোর নিচে রাতের রাজশাহীর সৌন্দর্য যেমন নজরকাড়া, দিনের সোনালু-জারুলের এই স্নিগ্ধতাও তেমনি অনন্য।
- বিষয় :
- প্রকৃতি
