ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জেলেদের কম চাল বিতরণ

তদন্তে সত্যতা মিললেও নিশ্চুপ প্রশাসন

ইউএনওর দাবি– তিনি তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাননি

তদন্তে সত্যতা মিললেও নিশ্চুপ প্রশাসন
×

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে চাল নিতে আসা অপেক্ষমাণ জেলেরা ফাইল ফটো

ভেদরগঞ্জ (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৮:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাটকা আহরণে বিরত থাকা জেলে পরিবারগুলোকে মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় দুই মাসের জন্য ৮০ কেজি করে ভিজিএফের (মৎস্য) চাল বিতরণ করে সরকার। এ চাল বিতরণে জেলেরা অনিয়মের অভিযোগ তুললে গত ৩ মার্চ উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে দুই সদসের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেয়ে দুদিন পর প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু ২ মাসের বেশি হয়ে গেলেও রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ রয়েছেন ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাফিজুল হক। 

ইউএনও দাবি করেছেন তিনি তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাননি। কিন্তু সমকালের কাছে আসা নথিতে দেখা গেছে, উপজেলা প্রশাসনের দপ্তরে তদন্ত প্রতিবেদনটি ৫ মার্চ আনুস্ঠাকিনভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। 
গত ৩ মার্চ সকাল ৮টা থেকে ট্যাগ অফিসার ভেদরগঞ্জ উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান সরকারের উপস্থিতিতে উপজেলার সখিপুর থানার দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু তার অনুপস্থিতে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চাল বিতরণ করা হয়। এতে চাল বিতরণে সংশ্লিষ্ট প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দর খানসহ অন্য ইউপি সদস্যরা প্রত্যেক জেলেকে ৪ থেকে ১০ কেজি করে চাল কম দেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে সুবিধাভোগী জেলেরা অভিযোগ তোলেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ভেদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কেএম রাফসান রাব্বি ও উপজেলা জেষ্ঠ্য মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ইমরান। পরে তাদের সমন্বয়েই তদন্ত কমিটি করে উপজেলা প্রশাসন। কমিটি ভূক্তভোগী জেলে, সাংবাদিক ও অন্যদের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা পায়। এরপর কমিটি ৫ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাঠায়। যার ডকেট নং ৪৩২। এর পর প্রায় ২ মাস পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নিশ্চুপ রয়েছেন ভেদরগঞ্জর ইউএনও হাফিজুল হক। জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি এখনও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাননি। তাই পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।
তদন্ত কমিটির সদস্য উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ইমরান বলেন, আমরা তদন্ত করে তা প্রতিবেদন আকারে উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছি। এখন ইউএনও পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রাফসান রাব্বি বলেন, আমি ঘটনা জানতে পেরে ওইদিনই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলাম। পরবর্তীতে আমাকে ও মৎস্য কর্মকর্তাকে তদন্ত করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হলে আমরা প্রতিবেদন তৈরি করে সঠিক সময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। 
দক্ষিণ তারাবুনিয়া এলাকার জেলে রাজিব হোসেন বলেন, আমাদের হক মেরে খেয়েছে চেয়ারম্যান ও ট্যাগ অফিসার। প্রশাসন তদন্ত করে সত্যতা পেলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হলো না। এর কারণ হলো আমরা নিরক্ষর গরীব জেলে। যদি অন্য কেউ হতো তাহলে এমনটি হতো না। 
নুরুদ্দি এলাকার ইমন হোসেন নামে আরেক জেলে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর থেকে এই ইউনিয়নে জেলেদের ৮-১০ কেজি করে চাল কম দেয়। আমরা তদন্ত কমিটির কাছে অনিয়মের সাক্ষী দিয়েছি। কিন্তু দু-মাসের বেশি হলেও এখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার বিষয়ক সংগঠন সিসিএস-এর শরীয়তপুর জেলার কো অর্ডিনেটর মিরাজ শিকদার সমকালকে বলেন, গরীব জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার পরেও রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তির এমন চুপ থাকাটা রহস্যজনক। গরীব জেলেদের সঙ্গে যারা অনিয়ম করেছে, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বিষয়টি উর্ধ্বতন দপ্তর খতিয়ে দেখবে বলে আমার বিশ্বাস। এই ধরনের অনিয়মে ছাড় দেওয়া হলে এই ঘটনা নিয়মিত ঘটবে।
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম সমকালকে বলেন, প্রতিবেদনে হাতে পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি ইউএনওর সাথে কথা বলে দেখি তিনি রিপোর্ট পেয়েছেন কি না। যদি পাওয়ার পরেও কোন ব্যবস্থা না নিয়ে গাফিলতি করেন তাহলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×