আড়াই কোটি টাকা কমে ইজারা নেওয়া হাটে দ্বিগুণ হাসিল
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ০৮:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার আলোচিত ‘আঠারবাড়ীয়া গোপী রায়ের বাজার’ ঈদুল আজহার হাটে দ্বিগুণ হাসিল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। গত বছর (১৪৩২ বঙ্গাব্দ) এই হাট সরকার ইজারা দিয়েছিল তিন কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকায়। চলতি বছরের (১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে এক কোটি ২৫ লাখ টাকায়। একে তো ইজারামূল্য কমেছে দুই কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা, তার ওপর ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে দ্বিগুণ হাসিল আদায়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গতকাল বুধবার উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের এই হাটে বিপুল সংখ্যক পশু উঠেছে। গতকাল থেকেই এখানে দ্বিগুণ হাসিল আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঢাকা থেকে আসা নাঈম নামে এক ব্যক্তি পাশের
সাজনপুর গ্রামের বাচ্চুর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকায় একটি গরু কেনেন। ক্রেতা-বিক্রেতা দুজনের কাছ থেকে ৬০০ করে ১২০০ টাকা হাসিল আদায় করে রসিদ দেওয়া হয়।
রসিদে মুদ্রিত ৬০০ টাকার অংক কেটে ১২০০ টাকা লেখা হয়েছে।
হাসিল দ্বিগুণ করায় ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। বাজিতপুরের জহিরুল ইসলাম ১৭ হাজার ৫০০ টাকায় একটি খাসি কেনেন একই উপজেলার শেখদী গ্রামের এসিনের কাছ থেকে। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৫০ টাকার জায়গায় ৩০০ টাকা করে মোট ৬০০ টাকা হাসিল আদায় করা হয়েছে। তারাও দ্বিগুণ হাসিল নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কটিয়াদী উপজেলার চান্দপুর ইউনিয়নের দিনামনি গ্রামের মাহফুজ গরু বিক্রি বাবদ তাঁর কাছ থেকে ৬০০ টাকা হাসিল আদায় করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
স্থানীয়ভাবে পরিচিত গোপী রায়ের বাজার গত বছর তিন কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন পাশের সাজনপুর গ্রামের জমসেদ আলী। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হাটটির ইজারা আগে আওয়ামী লীগের লোকজন সিন্ডিকেট করে নিতেন। বাজার প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলা ১৪৩১ সন পর্যন্ত বছরে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা ইজারার রেকর্ড আছে। অথচ এখানে বুধবারের সাপ্তাহিক হাটে দুই হাজারের মতো গবাদি পশু বিক্রি হয়। প্রতিটি গরুর বা মহিষ বিক্রি হলে ক্রেতা ৩০০ ও বিক্রেতা ৩০০ টাকা হাসিল দিয়ে আসছিলেন। ছাগল বিক্রি হলে ক্রেতা ও বিক্রেতা ১৫০ টাকা করে হাসিল দিতেন।
চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য এই হাট এক কোটি ২৫ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে নিকলী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোকারম সরদারকে। ইজারামূল্য কমে গেছে দুই কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা। প্রতিবছরের চৈত্র মাসে দরপত্র আহ্বান করা হয়। হাটের দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয় পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত মেয়াদকালের জন্য।
আগের ইজারাদার জমশেদ আলী জানিয়েছেন, গরু ও মহিষ বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে ৬০০ টাকা হাসিল হাদায় করতেন। ছাগলের ক্ষেত্রে যা ছিল ১৫০ করে ৩০০ টাকা। এরপরও এক বছরে ছয় কোটি টাকার বেশি হাসিল আদায় হয়েছে। এই টাকা থেকে নানা দলের নেতাদের নির্বাচনের খরচও দিয়েছেন। নির্বিঘ্নে ইজারাদারি করতে গিয়ে আরও বিভিন্ন মহলে
টাকা দিতে হয়েছে। এর পরও তিনি লাভবান ছিলেন। এবার তিনি প্রয়োজনে পাঁচ কোটি টাকায় ইজারা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু নানামুখী প্রতিবন্ধকতার কারণে ইজারার দরপত্রে অংশ নিতে পারেননি।
জমশেদ আলীর দেওয়া তথ্যমতে, বুধবার সাপ্তাহিক হাটে অন্তত দুই হাজার পশু বিক্রি হয়। প্রতি হাটে প্রায় ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত হাসিল আদায় হয়। কোরবানির ঈদের প্রতি হাটে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা হাসিল আদায় হয়। তিনি এমন এক হাটে ৫৩ লাখ টাকাও হাসিল পেয়েছেন। এ জন্য গত বছর দরদাতাদের কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে এক লাফে ইজারামূল্য বাড়িয়ে তিন কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকায় হাটটি ইজারা নিয়েছিলেন। এতে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব পেয়েছিল।
মোকারম সরদার এই হাট ইজারা নিয়েই এবার হাসিলের পরিমাণ দ্বিগুণ করেছেন। গতকাল বুধবার তাঁর নম্বরে কল দিলে বলেন, ‘গত বছর কত টাকায় ইজারা হয়েছে, সেটা বড় কথা নয়। ১৫ বছর ধরে ২৫ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছে। সেই তুলনায় আমি অনেক বেশি দিয়ে ইজারা নিয়েছি।’ তিনি বুধবারের হাটে ১২০০ টাকা হাসিল আদায় বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। পরে বলেন, ‘আমি ঢাকায় আছি। যারা হাসিল আদায় করার দায়িত্বে আছেন, আমি তাদের নিষেধ করে দেব।’
দ্বিগুণ হাসিল আদায় বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহানা মজুমদার মুক্তিকে প্রশ্ন করলে জানান, তাঁর কাছেও এমন অভিযোগ এসেছে। তিনি ইজারাদারকে বিষয়টি জানালে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, গতকাল বুধবার কিশোরগঞ্জে জেলার সকল উপজেলা কমিটির সদস্যদের ওরিয়েন্টেশন হয়। এতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান অংশ নেন। তাঁর কাছে কয়েকজন নিকলীর এই হাটের ইজারা নিয়ে দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তখন পরিচালক বলেছেন, কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তারা তদন্ত করবেন।
- বিষয় :
- হাট-বাজার
