ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত

১০ লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে রাশিয়া পাঠান জাকিয়া

১০ লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে রাশিয়া পাঠান জাকিয়া
×

ছেলে জাহাঙ্গীরের ছবিটিই এখন শেষ চিহ্ন জাকিয়া বেগমের। সেটি বুকে জড়িয়ে আহাজারি করছেন তিনি। শনিবার কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বাগপাড়া গ্রামে। ছবি: সমকাল

মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ২০:১৯ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১০:২৩

বড় ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেনকে (২৫) রাশিয়া পাঠাতে ১০ লাখ টাকা ঋণ করতে হয় মা জাকিয়া বেগমকে। ঢাকার একটি এজেন্সিকেই তারা দেন ৮ লাখ টাকা। গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া যান জাহাঙ্গীর। পরিবারের আশা ছিল, ঋণ শোধ করবেন তিনি। সেই সঙ্গে ছোট ভাই-বোনকে দেখবেন। তাদের আশা মিলিয়ে গেছে শুক্রবার পাওয়া সংবাদে। এদিন এক সহকর্মীর মাধ্যমে জাহাঙ্গীরের স্বজনরা জানতে পারেন, ইউক্রেনের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে ১৮ মে জাহাঙ্গীর মাইন বিস্ফোরণে অন্য দুই বাংলাদেশির সঙ্গে নিহত হয়েছেন।

শনিবার কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের বাগপাড়া গ্রামে গেলে তাঁর স্বজনদের আহাজারির চিত্র দেখা যায়। এই গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের বড় ছেলে জাহাঙ্গীর। তাঁর ছোট ভাই জাভেদ হোসেন ঢাকার এ কে এম রহমত উল্লাহ কলেজে অনার্স শেষ বর্ষে পড়ছেন। পাশাপাশি পিয়নের কাজ করছেন। ছোট বোন জান্নাতুল হাবিবা (১২) এলাকার কান্দাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে।

সন্তানের জন্য নিজের জীবনের লড়াইয়ের গল্প বলতে গিয়ে বুক চাপড়ে আহাজারি করছিলেন জাকিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টসে কাজ কইরা দুই পোলারে পড়াইছি। কোনো সঞ্চয় করলাম না। ১০ লাখ টেহা ঋণ কইরা বড় পোলারে রাশিয়া পাডাইছিলাম। ভাবছিলাম রোজগার কইরা ঋণও শোধ দিব, সংসারেরও উন্নতি করব। আর কোনো অভাব থাকব না, দুঃখ-কষ্ট থাকব না। এহন সব শেষ অইয়া গেল। অহন আমার কী অইব। ছোট মেয়েডারে কেডা দেখব?’

রাশিয়া থেকে টাঙ্গাইলের মৃদুল নামে জাহাঙ্গীরের এক বন্ধু গত শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ভিডিও কলে তাঁর মৃত্যুর খবর জানান। এর পর থেকেই পরিবারে চলছে আহাজারি। পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের কান্না কেউ থামাতে পারছেন না।

বাগপাড়া গ্রামে টিনের ঘরে বসবাস করে জাহাঙ্গীরের পরিবার। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে জাকিয়া বেগম জানান, তাদের বাবা হাবিবুর রহমান চার বছর আগে সংসারের চিন্তায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। দুই বছর আগে মারা যান তিনি। বড় ছেলে জাহাঙ্গীর অনার্স পাস করেন। তিন বছর আগে ফুপাতো বোন, একই ইউনিয়নের মধ্য নানশ্রী গ্রামের রফিকুল ইসলামের মেয়ে মাশুকা হোসেনকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির একমাত্র ছেলে আমান হোসেনের বয়স এখন দুই বছর। 

স্বজনদের তথ্যমতে, জাহাঙ্গীর ১০ লাখ টাকা ঋণ করে ঢাকার মহাখালীর একটি জনশক্তি রপ্তানিকারী এজেন্সির মাধ্যমে গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া যান। এজেন্সিকে আট লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছিল, রাশিয়ায় ভালো বেতনে হোটেলে চাকরি দেবে। কিন্তু সেখানে নিয়ে শূকরের একটি খামারে কাজ দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হতো জাহাঙ্গীরকে। খাবার দেওয়া হতো না ঠিকমতো। কাজ ছেড়ে দিতে চাইলে ভালো কাজের কথা বলে কাগজে সই রেখে জাহাঙ্গীরকে গত ১২ এপ্রিল ঢুকিয়ে দেওয়া হয় রুশ সেনাবাহিনীতে। প্রশিক্ষণ দিয়ে ৯ মে তাঁকে পাঠানো হয় ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে ১৮ মে মাইন বিস্ফোরণে মারা যান জাহাঙ্গীর। তাঁর সঙ্গে মাদারীপুরের সুরুজ কাজী ও কুমিল্লার ইউসুফ খান নামে দুই যুবকও নিহত হন বলে ভিডিও বার্তায় মৃদুল জানিয়েছিলেন। 

পুত্রশোকে পাগলপ্রায় জাকিয়া বেগম বিলাপের সুরে বলছিলেন, ‘মৃদুল জানাইছে, আমার পোলার লাশটা নাকি যেইহানে মরছে, ওইহানেই পইড়া আছে। আনার মতো কোনো অবস্থা নাই। আমি আমার জাহাঙ্গীরের লাশ চাই। তোমরা সবাই আমার জাহাঙ্গীরের লাশ আইনা দেও। আর কারও মায়ের বুক যেন খালি না হয়। এইভাবে যেন কেউ রাশিয়ার যুদ্ধে না নামায়।’

স্বজনরা জানান, মৃত্যুর কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীর স্ত্রী মাশুকার কাছে ৭৭ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। সেই টাকায় কিছু ঋণ শোধ করেন তারা। তবে মাশুকা ছেলে আমানকে নিয়ে শনিবার জেলা শহরে প্রবাসী কল্যাণ ব্যুরো অফিসে যাওয়ায় তাঁর মন্তব্য নেওয়া যায়নি। 

জাহাঙ্গীরের বড় চাচি রাবেয়া খাতুন বলছিলেন, জাহাঙ্গীরের পরিবারটি খুবই গরীব। চলার মতো অবস্থা নেই। এখন এরা পথে বসবে। সবাইকে মিলে সহায়তা করতে হবে। 

প্রতিবেশী অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মিজানুর রহমান বাবুল জানান, শৈশব থেকে জাহাঙ্গীরকে দেখে আসছেন। সে খুবই ভালো ছেলে ছিল। এলাকার কারও সঙ্গে কখনও বিরোধ হয়নি। তাঁর মৃত্যুতে পুরো এলাকার পরিবেশ শোকাবহ। জাহাঙ্গীরের অসহায় পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিতে সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি। 

কিশোরগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মাহফুজ-উল-আদিব বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে। জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলেই তারা আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেবেন। 

আরও পড়ুন

×