ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার ও পাঠানটুলীতে মশার উৎপাত

চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার ও পাঠানটুলীতে মশার উৎপাত
×

 নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৮:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের চকবাজার কাঁচাবাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে চাক্তাই খাল। পানি স্থির, উঠছে বুদ্‌বুদ, পুরো খালটাই যেন মশার বাসা। দিনদুপুরে সড়কের ওপর কয়েল জ্বালিয়ে কেনাবেচা করছেন ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা। খাল পাড়ে সেতুর কাছে আছে ডাস্টবিন। তবু কাঁচাবাজারের ময়লা ফেলা হচ্ছে খালে। ডাস্টবিনের আশপাশে পড়ে আছে শত শত ডাবের খোসা। সেগুলোতে জমে আছে পানি। সেই পানি ডেঙ্গু মশার প্রিয় স্থান। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে এমন চিত্রই দেখা গেল।

সেখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে রসুলবাগ আবাসিক এলাকা। আবাসিকের সামনেই চাক্তাই ডাইভারশন খাল। স্থানীয়দের কাছে এটি বির্জা খাল নামে পরিচিত। এই খালে বাঁধ দিয়ে চলছে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ। দুই পাশে নির্মাণ করা হচ্ছে দেয়াল। বাঁধের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির প্রবাহ। এতে বদ্ধ পানিতে বাড়ছে মশার প্রজনন। খালের বাঁধ দ্রুত অপসারণ করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। খাল-নালায় দেওয়া বাঁধের কারণে মাসখানেক আগে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা হয় শহরে।   

‘মশা মারা শিখতে চট্টগ্রামের মেয়রের যুক্তরাষ্ট্র যাত্রা এবং প্রধানমন্ত্রীর ডোবার পাশে বসে উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করার পরামর্শ’ নিয়ে তোলপাড় চলছে চট্টগ্রামে। মশা নিধনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা ও ল্যাব পরিদর্শনে আগ্রহী, তখন শহরের প্রাণকেন্দ্র চকবাজারে মশার উৎপাত নিয়ে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা। 

সামনে বর্ষা, বন্দর নগরের মানুষ আছেন ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া আতঙ্কে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭৬ জন, মারা গেছেন একজন। দুই মাস ধরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। চিকুনগুনিয়ার জন্য শহরের যে ২০টি এলাকা অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, চকবাজার তার একটি। স্থানীয়রা জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মশক নিধন কর্মীরা বছরে দু-একবার ওষুধ ছিটাতে আসেন। তবে এসব ওষুধে কাজ হয় বলে মনে করেন না তারা। কারণ সকালে ওষুধ ছিটানোর জায়গায় বিকেলে ভনভন করে মশা। 
গবেষকরা বলছেন, চট্টগ্রাম শহরে দ্রুতগতিতে মশার প্রজনন ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১ ঘণ্টার মধ্যে লার্ভা পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়।
সন্ধ্যার দিকে সবচেয়ে বেশি মশার উৎপাত হয় চিকুনগুনিয়ার আরেক হটস্পট পাঠানটুলী এলাকায়। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় সিটি করপোরেশন নালা পরিষ্কার করলেও জনসাধারণের ফেলা আবর্জনায় তা আবার ভরে যায়। বেশির ভাগ নালায় জমে থাকছে পানি। ফলে মশার প্রজনন ঘটছে অবাধে। এখানে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কখন ওষুধ ছিটিয়েছেন, তা মনে করতে পারেন না বাসিন্দা মনির হোসেন। তিনি বলেন, চসিকের মশক নিধন কর্মীদের দেখা যায় কালেভদ্রে।    

চকবাজারের রসুলবাগে বাড়ি করেছেন স্থানীয় একটি মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, এই এলাকা মশার নিরাপদ আবাসস্থল। বর্ষায় বির্জা খালে পানিপ্রবাহ থাকলেও শুকনো মৌসুমে এটি ডোবায় পরিণত হয়। এ সময় মশার উৎপাত বাড়ে। গত এক বছরে সিটি করপোরেশন এখানে মাত্র একবার মশার ওষুধ ছিটিয়েছে। তাও সরকারদলীয় এক নেতার মাধ্যমে তদবির করে মশক নিধন কর্মীদের আনতে হয়েছে। 

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের গত ৩১ মে’র প্রতিবেদন অনুযায়ী এপ্রিল থেকে বন্দরনগরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। মে মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৭ জন, যা গত চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১৭৬ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯ ও মে মাসে ৩৭ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে একজন মারাও যান। 
২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গু রোগী ছিল ২৬৯ জন। পুরো বছরে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন, মারা যান ২৭ জন। 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, চট্টগ্রাম শহরে মশার বংশবিস্তার হয় দ্রুত। শহর থেকে মশার লার্ভা সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এনে দেখি সেগুলো উড়ছে। লার্ভা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়। তাই সিটি করপোরেশনের উচিত পূর্ণাঙ্গ মশার পাশাপাশি লার্ভা ধ্বংসে মনোযোগী হওয়া। 
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, মশক নিধনে খালনালা পরিষ্কার করা হয়েছে। বির্জা খালের বাঁধ শিগগিরই অপসারণ করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক বিটিআই ছিটানো হচ্ছে। এই ওষুধের কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমেছে। দেশি প্রযুক্তির ভেষজ ওষুধ প্রয়োগেরও চিন্তা আছে। 

আরও পড়ুন

×