এক বছর খুঁজে বাকপ্রতিবন্ধীকে বাড়ি ফেরালেন তিনি
শরিফুল আলমের সঙ্গে শফিকুল ইসলাম সমকাল
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৮:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
শরীরে জমে থাকা ধুলা-ময়লা, মলিন আর অপরিচ্ছন্ন পোশাক, মাথার চুলে জট বেঁধে গেছে বহুদিনের অযত্নে। নিজের নাম, বাড়ি কিংবা পরিবারের পরিচয় কিছুই জানাতে পারছিলেন না যুবকটি। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের কারওয়ান বাজার এলাকায় নিজের চায়ের দোকানের সামনে বছরখানেক আগে বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ওই যুবককে দেখেন শরিফুল আলম। পার্শ্ববর্তী সিংগারদিঘী গ্রামের বাসিন্দা শরিফুল আলম তাঁকে কাছে ডেকে নেন। অনাহারী মানুষটির মুখে খাবার তুলে দেন। পরে নিয়ে যান নিজের বাড়িতে। টানা এক বছর নিজের পরিবারের একজন সদস্যের মতো করে আগলে রাখেন।
আশ্রয় দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি শরিফুল আলম। শুরু করেছিলেন তাঁকে আপনজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার যাত্রা। এক বছর ধরে খুঁজে ঠিকানা বের করে গত বুধবার তাঁকে ফেরান তাঁর বাড়িতে। জানা যায়, যুবকটির নাম শফিকুল ইসলাম। বয়স ২৪ বছর। তিন বছর আগে ময়মনসিংহ থেকে নিখোঁজ হন তিনি। বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধিতার পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যহীনও। লেখাপড়াও জানেন না।
শরিফুল আলম দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছেন তাঁর আশ্রয়ে থাকা শফিকুলের পরিবারকে। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করেছেন, পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলেছেন, সম্ভাব্য সব পথেই চেষ্টা করেছেন যুবকের পরিচয় খুঁজে বের করতে।
সম্প্রতি শরিফুল আলম শ্রীপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এর পর শফিকুলকে নিয়ে যান পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের কাছে। পিবিআইয়ের একটি দল ব্যক্তি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচয় অনুসন্ধান শুরু করে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিলে বেরিয়ে আসে জাতীয় পরিচয়পত্র তথা বিস্তারিত পরিচয়। জানা যায় তাঁর বাবা-মার নাম ও গ্রামের ঠিকানা। পরে এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। খবর পেয়ে শফিকুল ইসলামের মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা গাজীপুরে ছুটে আসেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখানোর পর শফিকুলকে তাঁর পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয়।
শফিকুল ইসলাম ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার কিসমত আমোদাবাদ গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে। এনআইডি অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৯৯ সালের ৩০ অক্টোবর। তিন বছর আগে ঘর ছাড়েন তিনি। এর থেকে তাঁর সন্ধান পাচ্ছিল না পরিবার। তিনিও পারছিলেন না ফিরতে। দুই বছর অন্য কোথাও ঘুরে বছরখানেক আগে শরিফুল আলমের আশ্রয়ে আসেন তিনি।
পিবিআই পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, ওই যুবককে পরিবারের কাছে তুলে দেওয়ার সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শরিফুল আলম ও শফিকুল ইসলাম পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকেন। উপস্থিত সবার চোখ ছলছল করে ওঠে। শফিকুল ইসলামের চোখে মুখে ফুটে ওঠে মা-বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দ।
- বিষয় :
- বাকপ্রতিবন্ধী