ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

ডিবি হেফাজতে মৃত্যু

ছাত্রলীগ কর্মী প্রান্তকে আটকের মুহূর্তে কী ঘটেছিল—দেখা গেল ভিডিওতে

ছাত্রলীগ কর্মী প্রান্তকে আটকের মুহূর্তে কী ঘটেছিল—দেখা গেল ভিডিওতে
×

মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত

ফরিদপুর অফিস

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ১৯:০৪ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ | ২০:০৫

ফরিদপুরে আটকের পর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত (২৪) নামে এক যুবকের। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী প্রান্তকে আটকের মুহূর্তে কী ঘটেছিল তা দেখা যাচ্ছে সামাজিকমাধ্যম ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে।

গত ২১ জুন বিকেল ৫টার দিকে প্রান্তকে আটক করে ডিবি। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় মায়ের সামনেই তাকে মারধর করা হয়। এরপর ডিবি হেফাজতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায়  ২২ জুন সকালে তার মৃত্যু হয়। প্রান্ত ছাত্রলীগের কর্মী বলে দাবি করেছেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তামজিদুল রশিদ চৌধুরী রিয়ান।

ভাইরাল ভিডিওটি ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের। এতে দেখা যায়, মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত মধুখালীর পশ্চিম গোন্দারদিয়া মহল্লায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে লুঙ্গি, কাঁধে একটি ব্যাগ। সেখানে প্রান্ত ছাড়া আরও তিনজন ছিলেন। ডিবি পুলিশ হিসেবে তারা ওই অভিযানে অংশ নেন। ওই তিনজনের একজন লাল টি-শার্ট পরা। তিনি প্রথমে প্রান্তের গতিরোধ করেন, ধাক্কা দেন এবং কিছু বলার চেষ্টা করেন। এ সময় সাদা টি-শার্ট পরা ডিবির আরেক সদস্য এসে এক হাতে প্রান্তর কোমর ধরেন। তখন প্রান্তকে কিছু বলতে শোনা যায়।

ভিডিওর ১৪ সেকেন্ডে প্রান্তকে তার দুই হাত দিয়ে দুই কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ৩৬ সেকেন্ডে গালি দিয়ে প্রান্তর মাথায় থাপ্পড় দেন সাদা টি-শার্ট পরা ব্যক্তি। এ সময় লাল টি-শার্ট পরা ব্যক্তি তাকে বাধা দিয়ে বলেন, ‘মারিস না।' তখন ক্রিম রঙের প্যান্ট ও অ্যাশ চেক শার্ট পরা আরেক ব্যক্তিকে ক্যামেরায় দেখা যায়। 

ভিডিওর ৪৩ সেকেন্ডে অ্যাশ রঙের শার্ট পরা ব্যক্তি মোবাইল ফোনে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘লাঠি নিয়ে মরিচ বাজার এলাকায় আসেন, দ্রুত আসেন, দ্রুত।’ এ কথা বার বার বলতে শোনা যায়। 

ভিডিওর এক মিনিট ৩২ সেকেন্ডে প্রান্তর শরীর তল্লাশি করতে দেখা যায়। এক মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে দেখা যায়, সিলভার রঙের একটি মাইক্রোবাস সেখানে আসে। এ সময় আগের লোকজনের সঙ্গে পরে যুক্ত হওয়া ব্যক্তি (অ্যাশ শার্ট) প্রান্তকে তল্লাশি শুরু করেন। মাইক্রোবাস থেকে নারীসহ আরও কয়েকজন সেখানে যোগ দেন। দুই মিনিট ৭ সেকেন্ডে দেখা যায়, কয়েক হাত দূরে কিছু একটা দেখে অ্যাশ শার্ট পরা ব্যক্তি বলে উঠেন, ‘এই যে এক টোপলা, এই যে।’ তখনও প্রান্তর শরীর তল্লাশি চলছিল। 

প্রান্তের বিধবা মা খাদিজা আক্তার পরে ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, একপর্যায়ে তাকে নিয়ে ডিবি সদস্যরা বাড়িতে আসেন।  বাড়িতে এসে নারীদের দিয়ে তার শরীর তল্লাশি করানো হয়। প্রান্ত ও তার শোয়ার ঘর তল্লাশি করে তছনছ করা হয়। পরে প্রান্তকে তারা উঠিয়ে নিয়ে যায়। রাতে ৬৫ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রান্তকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তার আত্মীয় সোহেল মুন্সীর সঙ্গে ডিবি পুলিশের কথা হয় বলে উল্লেখ করেন খাদিজা আক্তার।

তিনি বলেন পরে ডিবি আমাকে বলে,  ‘এ ছেলে কলেজে পড়ে, ছাত্রলীগ করে, আজ তাকে ছাড়া হবে না। কাল সকালে এক লাখ টাকা দিয়ে ফরিদপুর আসেন।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সকালে আমি এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যাই। ছেলে অসুস্থ হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে শুনে হাসপাতালে যাই। গিয়ে ছেলের লাশ পাই। আমার জীবিত ছেলেকে নিয়ে গেল সবার সামনে থেকে। হাসপাতালে গিয়ে তার লাশ পেলাম।’ প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলে হত্যার বিচার দাবি করেন তিনি। নিহত মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত ফরিদপুরের মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া মহল্লার বাসিন্দা মৃত এসকেন হায়দারের ছেলে। 

এদিকে, ডিবি পুলিশের দাবি, ওই যুবককে নির্যাতন করা হয়নি। তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়েছে। 

প্রান্তর মৃত্যুর পর ২১ জুন দুপুরে নিজ কার্যালয়ে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, 'গোয়েন্দা শাখা অভিযান চালিয়ে মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তকে বাড়ি থেকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করে। পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ বোধ করেন। তাৎক্ষণিক তাকে প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।'

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত হয়েছি, তার শরীরে কোনো ধরনের জখমের চিহ্ন ছিল না। পুলিশের হেফাজতে তাকে আঘাত বা শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি।’

মধুখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ সতেজসহ স্থানীয় বিএনপির তিন নেতা একে হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপন বলেন, ‘পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। আমি মধুখালীর ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তের মৃত্যুর সঠিক তদন্ত’ দাবি করছি।’

আরও পড়ুন

×