ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা, দায় এড়ানোর চক্করে অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীরা
তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে ১০০ শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এই ‘মারাত্মক ভুল’ ও অব্যবস্থাপনার দায় নিয়ে শিক্ষা বোর্ড এবং কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি কাদা ছোড়াছুড়ি। তবে এতে বোর্ডের কোনো দায় নেই বলে দাবি করেছেন উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আবু খায়ের মো. কামাল হাসান। অন্যদিকে তদন্তের আগে নিজেকে দোষী মানতে নারাজ কেন্দ্র সচিব শওকত আলী মীর। তবে সংশ্লিষ্টদের এই দায় এড়ানোর চক্করে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
গত শনিবার সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে ২০২৬ সালের এইচএসসি বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা হয়। কিন্তু একটি কক্ষে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের ২০২৬ সালের সিলেবাসের পরিবর্তে ২০২৫ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পরপরই তারা সিলেবাস ও সালের গরমিল দেখতে পান। বিষয়টি কক্ষ পরিদর্শকদের মাধ্যমে কেন্দ্র সচিব ও কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শওকত আলী মীরকে জানানো হয়। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা বোর্ড বা জেলা প্রশাসনকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ধমক দেওয়া হয়। অধ্যক্ষ পরীক্ষার্থীদের বলেন, ‘তোমরা যা পারো তাই লেখো, কোনো কথা বলা যাবে না।’ বাধ্য হয়ে ভুল প্রশ্নেই পরীক্ষা শেষ করতে হয় ১০০ শিক্ষার্থীকে।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এই ঘটনার পর কেন্দ্র কমিটি বাতিল করে অধ্যক্ষ শওকত আলী মীরকে কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। তারা আগে তদন্ত করুক। তদন্তের আগে তাঁকে দোষী বলার সুযোগ নেই। কেন্দ্র সচিবের দায়িত্ব থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিটা রিপোর্টে এলেই বোঝা যাবে দায় কার। এর চেয়ে বেশি কিছু এখন বলতে চান না।
এদিকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ঘটনার পুরো দায় কলেজের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দাবি করেছেন, এই ঘটনায় বোর্ডের কোনো দায় নেই। তবে বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ওই কেন্দ্রে ২০২৫ সালের পরীক্ষার্থী ছিল ৬৫ জন, যাদের জন্য কোড অনুযায়ী ১০০টি প্রশ্নের একটি খাম বরাদ্দ ছিল। কিন্তু কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ভুল করে আরও ১০০টি প্রশ্ন বাড়তি নিয়ে যায়। এখন প্রশ্ন উঠেছে, খাম বা ট্রাঙ্কে ভুল ছিল নাকি বোর্ডে বিতরণের সময় ভুল হয়েছে? বোর্ড কীভাবে অতিরিক্ত ১০০টি প্রশ্ন সরবরাহ করল, সে বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারছেন না শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।
খাতা আলাদা করা হলেও থাকছে সমতার প্রশ্ন
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দেওয়া ১০০ শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র আলাদা প্যাকেটে করে বোর্ডে আনা হয়েছে। উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জানিয়েছেন, এই খাতাগুলো আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
তবে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা বলছেন, ভিন্ন সিলেবাসের প্রশ্নে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের খাতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তার কোনো স্পষ্ট নীতিমালা নেই। যদি তাদের অতিরিক্ত সুবিধা বা গ্রেস মার্ক দেওয়া হয়, তবে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্য হবে। ফলে সবার জন্য সমতা নিশ্চিত করা এখন বোর্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্নপত্র পরিবহন ও বিতরণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আফসানা তাসলিম সমকালকে বলেন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ শুধু নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশ্নগুলো বিজি প্রেস থেকে নিয়ে আসে। এরপর ট্রেজারি বা থানা থেকে এগুলো বুঝে নেয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এক্ষেত্রে কার গাফিলতি বা দায়, তা বলতে পারবেন না তারা।
ঘটনা তদন্তে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের আরেক উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তবে কমিটি এখনও চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
শিক্ষাবিদ স্বপন ধরের ভাষ্য, কেবল কেন্দ্র সচিবের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। বোর্ডের উচ্চপর্যায়ে যে অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতি বিদ্যমান, তা দূর না করলে এমন ভুল বারবার ঘটবে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আবু খায়ের মো. কামাল হাসান বলেন, বিজি প্রেস থেকে আটজন কর্মকর্তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিজি প্রেসে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের গাফিলতির কথা অস্বীকার করেন তিনি।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এনামুল হকের ভাষ্য, ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- শিক্ষার্থীরা