ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পটুয়াখালী বিএনপিতে ‘দ্বন্দ্ব’

এমপির সুপারিশে বিদ্যালয়ে সভাপতি না দেওয়ায় কর্মকর্তা প্রত্যাহারের অভিযোগ

এমপির সুপারিশে বিদ্যালয়ে সভাপতি না দেওয়ায় কর্মকর্তা প্রত্যাহারের অভিযোগ
×

ফাইল ছবি

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:২৩ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:৩৮

পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জ উপজেলায় একটি বিদ্যালয় পরিচালনায় অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ও জেলা পরিষদ প্রশাসকের দ্বন্দ্বে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শককে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

বিএনপির দলীয় ও শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, মীর্জাগঞ্জ উপজেলার মজিদবাড়িয়া ইউনিয়নে কুদবারচর আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি নিয়ে ওই বিরোধের সূত্রপাত হয়। আব্দুর রশিদ মোল্লা নামে একজনকে কমিটির সভাপতি করার প্রস্তাব দেন পটুয়খালী-১ (সদর-দুমকী ও মীর্জাগঞ্জ) আসনের এমপি আলতাফ হোসেন চৌধুরী। 

অন্যদিকে পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য সিদ্দিকুর রহমান রাজ্জাককে সভাপতি করতে ডিও লেটার দেন। বোর্ড কর্তৃপক্ষ সিদ্দিকুরকে সভাপতি করলে ক্ষুব্ধ হন আলতাফ হোসেন চৌধুরী। পরে তাঁর অনুসারী মজিদবাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মৃধা বিদ্যালয় পরিদর্শক সাইফুর রহমান হাওলাদারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনে শিক্ষামন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অভিযোগপত্রে সুপারিশ করেন আলতাফ হোসেন চৌধুরী। গত ২০ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মনজুর আলম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে সাইফুর রহমানকে নগরীর সরকারি বরিশাল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক পদে বদলি করা হয়।

বিএনপির স্থানীয় কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। স্থানীয় উন্নয়ন ও পদায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা বিপরীতমুখী অবস্থান নেন। এমনকি পটুয়াখালী-১ আসনের আওতাধীন তিন উপজেলার প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠনে এমপি ও জেলা বিএনপির নেতা পাল্টাপাল্টি ডিও লেটার দেন। আলতাফ হোসেন চৌধুরী সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও বিমানবাহিনীর প্রধান ছিলেন। 

কুদবারচর আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া মোজাম্মেল হোসেন সমকালকে বলেন, প্রধান শিক্ষক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দেওয়া তালিকায় আব্দুর রশিদ মোল্লার নাম ১ নম্বরে ছিল। স্থানীয় এমপি তাঁর নামোল্লেখ করে শিক্ষাবোর্ডে পৃথক ডিও লেটার দেন। কিন্তু বিদ্যালয় পরিদর্শক অর্থের বিনিময়ে সিদ্দিকুর রহমানকে সভাপতি করেছেন। সিদ্দিকুর কোন পক্ষের–এ বিষয়ে জানতে চাইলে জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান মোজাম্মেল। 

অভিযোগ প্রসঙ্গে সদ্য বদলি হওয়া বিদ্যালয় পরিদর্শক সাইফুর রহমান বলেন, ‘মীর্জাগঞ্জের একটি বিদ্যালয়ের জন্য আগস্ট মাসের প্রথম দিকে আমার কাছে দুটি ডিও লেটার আসে। প্রথম আসে জেলা পরিষদ প্রশাসকের ডিও লেটার। পরে আসে এমপির ডিও লেটার।’ তিনি বলেন, জেলা পরিষদ প্রশাসক দাতা সদস্য সিদ্দিকুর রহমানকে সভাপতি মনোনীত করার সুপারিশ করেন। এমপি আরেকজনের জন্য প্যাডে নয়, সাদা কাগজে সুপারিশ পাঠান। বোর্ডের পরিপত্র অনুযায়ী দাতা সদস্যকে মনোনীত করা হয়। এতে এমপির এক অনুসারী শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দেন। অভিযোগ তদন্ত না করে তাঁকে বদলি করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাদা বলেন, শিক্ষা বোর্ড প্রায় এক মাস আগে সিদ্দিকুর রহমানকে সভাপতি করে কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। সিদ্দিকুরের নাম তালিকার ২ নম্বরে ছিল। তিনজনের তালিকার যে কাউকে সভাপতি করার এখতিয়ার বোর্ডের আছে। কারও পক্ষে ডিও লেটার ছিল কিনা, সেটি তাঁর জানা নেই। 

এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক স্নেহাংশু সরকার কুট্টি বলেন, ‘যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনীত করার জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানরা আমার কাছে যান। তাদের পছন্দ অনুযায়ী বোর্ডে সুপারিশ পাঠাই। কুদবারচর আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও সুপারিশ করেছিলাম। এখন শুনতে পাচ্ছি স্থানীয় এমপিও প্রত্যেক বিদ্যালয়ের সভাপতির জন্য ডিও লেটার দেন এবং নিজে বোর্ডে যান।’ 

জানতে চাইলে আলতাফ হোসেন চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘মীর্জাগঞ্জের একটি বিদ্যালয়ের কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কিছু লোকজন আমার কাছে আসেন। আমি অভিযোগপত্রের ওপর তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছি। সে অনুযায়ী হয়তো মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিয়েছে।’ আব্দুর রশিদ মোল্লাকে সভাপতি করার সুপারিশের বিষয়ে তিনি বলেন, সুপারিশের জন্য তাঁর কাছে অনেক লোক যান। কাউকেই ফেরান না। রশিদ মোল্লার বিষয়টি তিনি মনে করতে পারছেন না। 

জানতে চাইলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল বলেন, ‘মীর্জাগঞ্জের একটি বিদ্যালয়ের কমিটি অনুমোদনে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিদর্শক সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম তুলেছে একপক্ষ। এর একটি লিখিত অভিযোগ এমপির সুপারিশসহ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে পরিদর্শককে কলেজে বদলি করা হয়। এমপির বোর্ডে যাওয়া প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, ‘ঢাকা থেকে পটুয়াখালী যাওয়ার পথে আমার আমন্ত্রণে বৃহস্পতিবার বোর্ড পরিদর্শন করেন তিনি।’

আরও পড়ুন

×