ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাজীপুর

বিদ্যুৎ বিল দেয় না সওজ, সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় অন্ধকারে ফ্লাইওভার

বিদ্যুৎ বিল দেয় না সওজ, সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় অন্ধকারে ফ্লাইওভার
×

প্রতীকী ছবি

ইজাজ আহমেদ মিলন, গাজীপুর

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১৮ | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:২২

মাওনা চৌরাস্তা ফ্লাইওভারের দুই দিকের ৩২টি খুঁটিতে বসানো ৬৪টি সড়কবাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল। ফলে গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ব্যস্ততম এই ফ্লাইওভারে রাতে তৈরি হয় ভূতুড়ে পরিবেশ। অন্ধকারে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন ফ্লাইওভারের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দূরপাল্লার বাস থেকে নামা যাত্রী, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, দেড় বছরের বেশি সময় ধরে সড়ক বিভাগ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে না। যে কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে অচল হয়ে পড়েছে সড়কবাতিসহ সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো।

স্থানীয়রা জানান, বছরের পর বছর ধরে বাতিগুলো জ্বলে না, জ্বালানোর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্ধকারের সুযোগে ফ্লাইওভারে ছিনতাইসহ নানা অপরাধের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাতে অপরিচিত যাত্রীরা ফ্লাইওভারের দুই দিকে নামার পর নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। ফ্লাইওভারে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোও পর্যাপ্ত আলো না থাকায় কার্যকরভাবে নজরদারি করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগ বাতিগুলোর সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, বছরের পর বছর ধরে বিল পরিশোধ করে না সওজ। এই কারণে লাইন বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। বিল পরিশোধ করলে সংযোগ দেওয়া হবে।

দিনের বেলায় অবশ্য চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাওনা চৌরাস্তা ও আশপাশের এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থাকে মানুষের ব্যস্ততা। শিল্পকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও নানা ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ঘিরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল এই এলাকায়। দূরপাল্লার বাসও মধ্যরাত পর্যন্ত যাত্রী ওঠানামা করে। কিন্তু রাত গভীর হলে ফ্লাইওভারের ওপর আলো না থাকায় নিরাপত্তার বিষয়টি বড় উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

স্থানীয় অটোরিকশাচালক আলমাস আলী বলেন, সড়কবাতি জ্বলে না। রাতে ফ্লাইওভারে অন্ধকার থাকে। অনেক সময় দূরপাল্লার বাস থেকে যাত্রীরা ফ্লাইওভারের ওপর নেমে নিচে যাওয়ার জন্য হাঁটেন। অন্ধকারের কারণে ঝুঁকিতে থাকেন তারা। আব্দুল আওয়াল নামে পিকআপ চালক জানান, এখানে আলো থাকলে মানুষের চলাচল যেমন স্বস্তিদায়ক হতো, তেমন অপরাধীদের তৎপরতাও কমতো।

পথচারী আতাউর রহমান বলেন, মাঝরাতে দূরপাল্লার বাস থেকে অপরিচিত যাত্রীরা নামার পর অনেক সময় ফ্লাইওভার উত্তর ও দক্ষিণ পাশ দিয়ে হেঁটে যান। অন্ধকারের কারণে তারা বিপদে পড়তে পারেন। তাঁর অভিযোগ, অন্ধকারের সুযোগে সেখানে বিভিন্ন ধরনের মালপত্র ফেলে যাওয়া হয়। ফ্লাইওভারের নিচে ও ওপরে একাধিক লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এক সময় মাওনা চৌরাস্তার প্রধান সমস্যা ছিল যানজট। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এই গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যানবাহনের চাপ সামলাতে নির্মাণ করা হয় ফ্লাইওভার। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল এটি উদ্বোধনের পর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলকারী দূরপাল্লা ও দ্রুতগামী যানবাহনের একটি বড় অংশ ফ্লাইওভার ব্যবহার করে চলাচল শুরু করে। এতে চৌরাস্তার যানজট অনেকটাই কমে আসে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্যমতে, মাওনা ফ্লাইওভারটি অ্যাপ্রোচসহ প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ এবং ১৯ মিটার প্রশস্ত। মূল ফ্লাইওভার ৪৫০ মিটার। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের আওতায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অর্থায়নে এটি নির্মাণ করা হয়। ব্যয় হয় ৭০ কোটি ২২ লাখ টাকার বেশি। আবদুল মোনেম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৭ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।

ফ্লাইওভারটি নির্মাণের ফলে মাওনা চৌরাস্তার বাণিজ্যিক গুরুত্বও বাড়তে থাকে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। মাওনা চৌরাস্তার ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম রাসেল বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণের পর মাওনার চেহারা অনেকটা বদলে যায়। ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ শুরু করে। ব্যাংক, বীমা ও নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের আনাগোনা থাকে। তবে ব্যস্ত এই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোটির ওপর রাতে আলো না থাকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ফ্লাইওভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে সড়কবাতি অচল থাকায় পথচারীদের ঝুঁকি বাড়ছে।

মাওনা হাইওয়ে থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান সমকালকে জানান, মাওনার প্রধান সমস্যা ছিল যানজট। তিনি যোগদানের আগেও রাস্তার দুপাশে শত শত ভাসমান দোকান ছিল, ফুটপাথ দখল করে ব্যবসা চলতো। যত্রতত্র গাড়ি রাখা হতো রাস্তার পাশে। এসবের কিছুই এখন নেই। সব উচ্ছেদ করা হয়েছে। মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু ফ্লাইওভারের অধিকাংশ সড়কবাতি জ্বলে না। ফলে রাতে ওপরের অংশে অন্ধকার থাকে। তবে অপরাধ দমনে সেখানে নজরদারি করে পুলিশ।

গাজীপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মাওনা ফ্লাইওভারে সৌরবাতি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরমধ্যে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানানো হয়েছে।

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ (মাওনা জোনাল অফিস) ডিজিএম শান্তুনু রায় সমকালকে বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ মাওনা ফ্লাইওভারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বিল পরিশোধ করে না সড়ক বিভাগ। সাড়ে তিন লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। এই কারণে গত জুন মাসে এই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×