লাল ফিতায় বন্দি ৫৩৯ কোটি টাকার দরপত্র
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) প্রস্তাবিত এক হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল ফ্যাকাল্টি ভবন নির্মাণের ৫৩৯ কোটি টাকার দরপত্র ঝুলে আছে আট মাস ধরে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক স্বাস্থ্য সচিবের নির্দেশেই দরপত্র-সংক্রান্ত ফাইলটি আটকে রাখা হয়েছিল।
যদিও ৩ সেপ্টেম্বর সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জনপ্রশাসন সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নতুন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী দায়িত্ব নেওয়ার পর ফাইলটি যাচাই-বাছাই করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের কাছে পাঠিয়েছেন। তাঁর দপ্তরেও দরপত্রগুলো দুই সপ্তাহ ধরে পড়ে রয়েছে। সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দরপত্রের প্রক্রিয়া সাধারণত ১০ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা।
দরপত্র নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণে হাসপাতাল নির্মাণকাজও পিছিয়ে গেছে। এতে পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক তৈরির প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অভিযোগের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
আট মাসেও হয়নি দরপত্র নিষ্পত্তি
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, রামেবি প্রকল্পের আওতায় এক বেজমেন্টসহ ১১ তলা হাসপাতাল ভবনের সিভিল, প্লাম্বিং, অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতায়ন ও বিল্ট-ইন সুবিধার কাজের জন্য চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
এরপর প্রস্তাবগুলো মূল্যায়নের পরিবর্তে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রেখে দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে দরপত্রের বৈধতা ছিল ১২ জুন পর্যন্ত। সময়মতো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী দরপত্র ও জামানতের মেয়াদ ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে স্পেকট্রা-ইউসিসি জেভি এবং ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড মেয়াদ বাড়াতে সম্মতি না দেওয়ায় বিধি অনুযায়ী তাদের দরপত্র মূল্যায়ন থেকে বাদ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ৪৯৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং এইচআইসিসি-এমএসসিএল জেভি ৫৩৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার দরপত্রের বৈধতা বাড়াতে সম্মতি দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ১১ জুলাই উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাওয়াদুল হকের সভাপতিত্বে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেখা যায়, এইচআইসিসি-এমএসসিএল জেভি দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী লিড পার্টনারের পরিবর্তে দ্বিতীয় অংশীদার প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার ই-স্বাক্ষরে দরপত্র জমা দিয়েছে। এ কারণে তাদের দরপত্রকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে, ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রাথমিকভাবে প্রশ্ন উঠলেও পরে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রে নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করেছে। এ অবস্থায় চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি মেয়াদ না বাড়ানোয় এবং একটি কারিগরি শর্ত পূরণ না করায় প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে। ফলে একমাত্র যোগ্য দরদাতা হিসেবে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে নির্বাচন করা হয়।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) অধ্যাপক জাওয়াদুল হক বলেন, ৫৩৯ কোটি টাকার হাসপাতাল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নে বিলম্ব হয়েছে মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে। তিনি জানান, দরপত্র জানুয়ারিতে খোলা হয়। এটি বড় প্রকল্প হওয়ায় এবং বিভিন্ন দিক থেকে ফোনে চাপ ও হুমকি আসায় টেকনিক্যাল ইভালুয়েশন কমিটির পাঁচ সদস্য সিদ্ধান্ত নেন, পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করবেন, যাতে কোনো ধরনের বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্ত না হয়। পরে টেন্ডার খোলার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে জানানো হয়, মূল্যায়ন কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখতে হবে। প্রথমে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) ড. সৈয়দা নওশীন পর্ণিনী স্বাস্থ্য সচিবের নির্দেশের কথা জানান। পরে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সভায় স্বাস্থ্য সচিব নিজেও বিষয়টি আপাতত স্থগিত রাখতে বলেন।
তবে ড. সৈয়দা নওশীন পর্ণিনী বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এ দরপত্রে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। স্বাস্থ্য সচিব (সাবেক) যেহেতু স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি, তিনি সরাসরি কথা বলেছেন।
জাওয়াদুল হক জানান, প্রয়োজনীয় সমন্বয় হওয়ার পর টেকনিক্যাল কমিটির তিনটি সভা সম্পন্ন হয় এবং মূল্যায়ন প্রতিবেদন ২৫ জুলাই মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর দপ্তর পরিবর্তনের পর বর্তমানে ফাইলটি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে রয়েছে।
ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের কর্মকর্তা ড. সায়মা হক বলেন, সব মূল্যায়ন শেষ। তারপরও শুধু সাবেক স্বাস্থ্য সচিবের কারণে দরপত্রটি আটকে রাখা হয়েছে। অনেক সময় এভাবে ফাইল আটকে রেখে অর্থ দাবি করা হয়। আমরা ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে দরপত্রে অংশ নিয়েছি। এ ধরনের হয়রানি কাম্য নয়।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর দরপত্র ও ক্রয় প্রক্রিয়া আরও সহজ করার চেষ্টা করছি। আশা করি, এই সমস্যা বেশি দিন থাকবে না।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শফিউল আলম বলেন, ক্রয়নীতি অনুসরণ করে কার্যাদেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে কোনো ভুল নেই। তবে হাসপাতাল বা সরকারি প্রতিষ্ঠানটি চাইলে আলাদাভাবে কেনাকাটা করতে পারত।
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দাবি করেছেন, সাবেক স্বাস্থ্য সচিবের নির্দেশে দরপত্র মূল্যায়নের কাজ স্থগিত ছিল। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাবেক স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী সমকালকে বলেন, আমি উপাচার্যের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কথা বলিনি। কিছু কর্মকর্তা আমার বিরুদ্ধে লাগতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এমন একটি অভিযোগ পেয়েছি। এরই মধ্যে দরপত্রটি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যে যাতে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সব জেলা-উপজেলায় থাকে, সেই বিষয়ে কাজ করছি।