বাঁধ ভেঙে ৪০ মিটার পদ্মায়
পদ্মার তীররক্ষা বাঁধে ভাঙনের কারণে দোকান সরিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল শুক্রবার শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর মাছবাজার এলাকায় সমকাল
শরীয়তপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মা নদীর ডান তীররক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলার সুরেশ্বর মাছবাজার এলাকায় এই ফাটল দেখা দেয়। ইতোমধ্যে বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়েছে।
গতকাল শুক্রবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, ভাঙনের আশঙ্কায় বাজারের প্রায় ২০টি দোকান ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার করা না হলে ভাঙন আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে সুরেশ্বর মাছবাজারসহ আশপাশের বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে। ধসের পর থেকে ঘরিষার ইউনিয়নের টিঅ্যান্ডটি মোড়, হালই সার, নন্দনসার, পাঁচগাঁওসহ আশপাশের প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের দেওয়া তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাঁধের ফাটল ধরা অংশের ২০ মিটার জায়গা নদীতে ধসে পড়েছে। রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত আরও ২০ মিটার বিলীন হয়ে যায়। এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার এলাকায় ফাটল দেখা দিয়েছিল। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল পতকা টানিয়ে দেয়।
সুরেশ্বর মাছবাজারের মাছ বিক্রেতা আব্দুল হামিদ বেপারী বলেন, বাঁধের অংশে নদীতে তলিয়ে যাওয়ায় তারা আতঙ্কে পড়েছেন। আশপাশের বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকার মানুষের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি দ্রুত ভাঙনকবলিত অংশে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য পাউবো কর্মকর্তাদের কাছে দাবি জানান।
খবর পেয়ে নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন ও শরীয়তপুর পাউবো কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জরুরি ভিত্তিতে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এলাকাবাসী ও পাউবো সূত্র জানায়, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নড়িয়া উপজেলার ঘরিষার, কেদারপুর, মোক্তারের চর, নড়িয়া পৌরসভা, জাজিরা উপজেলার কুণ্ডের চর ও বিলাশপুর ইউনিয়নের ৩০টি গ্রামে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। এতে নদী তীরবর্তী ৩০টি গ্রামের অন্তত ২০ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। শুধু ২০১৮ সালে ভাঙনের শিকার হয়েছে পাঁচ হাজার পরিবার। ওই বছর নড়িয়ার পাঁচটি ছোট-বড় বাজারের ৩৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি পদ্মায় বিলীন হয়। এ ছাড়া নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনও পদ্মায় তলিয়ে যায়। এরপর উপজেলার সুরেশ্বর লঞ্চঘাট থেকে জাজিরা উপজেলার সফি কাজির মোড় পর্যন্ত পদ্মা নদীর তীররক্ষা প্রকল্প নেয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ওই প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৪০৩ কোটি টাকা খরচে ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার নদীর তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও ১১ দশমিক ৮ কিলোমিটার চর খনন করা হয়। প্রথমে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরে নদীতে সিসি ব্লক ফেলা হয়। তার ওপর নদীর নিচ থেকে তীর পর্যন্ত সিসি ব্লক বসিয়ে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৯ সালে বাঁধের কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর সেটি উদ্বোধন করা হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে নদীর তলদেশের মাটি সরে যাচ্ছে। যে কারণে বর্ষাকালে পানি বৃদ্ধির সময় তীব্র স্রোতে ভাঙন দেখা দেয়।
নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্কের কথা জানিয়ে সুরেশ্বরের বাসিন্দা রতন মুন্সি আগের ভাঙনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আগের মতো ভাঙনের শিকার হতে চাই না। ইতোমধ্যে নদী এ পর্যন্ত এসেছে। আমরা চাই, দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকার গুরুত্ব দিয়ে এই ভাঙন রোধ করুক।’
শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মিল্টন হোসেন বলেন, বুধবার সুরেশ্বর মাছঘাট এলাকায় নদীর তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার অংশে ফাটল দেখা দেয়। পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে ফাটল দেখা দেওয়া অংশের প্রায় ২০ মিটার নদীতে তলিয়ে যায়। খবর পাওয়ার পর তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত জায়গায় জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে।
শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ বলেন, ‘এক ইঞ্চি মাটিও যেন নদীতে বিলীন না হয়, সে জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধের কাজ চলছে। সার্ভের মাধ্যমে চিহ্নিত এলাকায় এক সপ্তাহ জরুরি কাজ চালানো গেলে নদীভাঙন থেকে এলাকা রক্ষা করা সম্ভব বলে আমরা মনে করছি।’ অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
- বিষয় :
- বাঁধ