বগুড়া
হাসপাতালে বারবার শয্যা বাড়ে, জনবল-ভবন বাড়ে না
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল
এস এম কাওসার, বগুড়া
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে রোগী দেখতে হয় ১৬০ থেকে ১৭০ জন। প্রতিজনের জন্য সময় দেওয়া যায় বড়জোর দুই মিনিট। এ ছাড়া ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতে হয়। রোগীর চাহিদা অনুযায়ী সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। রোগী ও তাদের স্বজনরা গালি দেন, আমরা চুপ করে শুনি।’ এসব কথা বলছিলেন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের চিকিৎসক এ এস এম নোমান।
গত রোববার দুপুর ১টা ৭ মিনিটে চিকিৎসক নোমান বহির্বিভাগে ১৩৯ নম্বরের রোগী দেখছিলেন। আরও অন্তত ৩০ রোগী তখন বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন। এই হাসপাতালে রোগীর স্বজন ও কর্মরতদের মাঝেমধ্যেই বাগ্বিতণ্ডা হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, জনবল ঘাটতির কারণে রোগীকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না, তাই হট্টগোল বাধে। এতে পাঁচ জেলার মানুষের চিকিৎসার ভরসার স্থল হাসপাতালটির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
পাঁচশ শয্যার হাসপাতালটি ২০০৬ সালে স্থাপনকালে চিকিৎসক ২৩৮, নার্স ৫৩২, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ৫৩৬ জনসহ এক হাজার ৩৪২ জনবল ছিল। কয়েক বছরে ১৯০ জন বদলি ও অবসরে গেলেও পদগুলো শূন্য থেকে যায়। ৫০০ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি থাকে হাজারের বেশি। রোগীকে বারান্দায় ও মেঝেতে রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। জনবল ঘাটতির মধ্যেই ২০২১ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালটিতে ৭০০ শয্যা বাড়িয়ে ১২০০ শয্যা করে। তবে কর্মী বাড়ানো হয়নি, তৈরি করা হয়নি নতুন ভবনও।
এরই মধ্যে গত ১৬ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে হাসপাতালটিতে আরও ৬০০ শয্যা বাড়িয়ে ১৮০০ শয্যা করার কথা বলেছে। কিন্তু শয্যা অনুপাতে জনবল নিয়োগের নির্দেশনা নেই এতে।
রেজিস্টার অনুযায়ী গত ১৯ সেপ্টেম্বর ৪২টি বিভাগে রোগী ভর্তি দেখা যায় ২ হাজার ৫৩৪ জন।
২০২১ সালের জুলাই থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতবার সহিংসতা ঘটেছে এই হাসপাতালে। বিভিন্ন সময় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের নিরাপত্তা ও জনবল বাড়ানোর জন্য কর্মবিরতি পালন করেছেন। কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টার্নরা কর্মস্থলে ফিরলেও তাদের দাবি অপূর্ণই থেকে যায়।
ইন্টার্ন চিকিৎসক রিতুল মণ্ডল স্নিগ্ধ ও আহসান জারিফ বলেন, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা অনুপাতে জনবল নিয়োগ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া একজন রোগীর সঙ্গে একজনের বেশি স্বজন থাকতে না দিলে বিরোধ সৃষ্টি হবে না। অনেক সময় দেখা যায়, এক রোগীর সঙ্গে চার-পাঁচজন থাকে। কেউ কেউ ক্ষমতার দাপটও দেখান।
মেডিসিন বিভাগের চিত্র
হাসপাতালে ৪২টি বিভাগের মধ্যে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে মেডিসিন বিভাগে। বিভাগের ছয় ইউনিটে শয্যা ৩৫টি করে ২১০টি। গত ১৯ সেপ্টেম্বর রোগী ভর্তি দেখা যায় ৯৭৭ জন। শয্যা সংকটে রোগী বারান্দায় ও মেঝেতে রাখা হয়েছে। চিকিৎসক আছেন ১৬ জন, ইন্টার্ন ৮, ওয়ার্ডবয় ৩, নার্স ১৭ জন। রোগী ভর্তি অনুপাতে চিকিৎসক প্রয়োজন অন্তত ৫৬ জন, ইন্টার্ন ৪২, নার্স ৬৪, ওয়ার্ডবয় ২২ জন।
ভর্তি থাকা রোগী আবদুস সালামের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টায় মাত্র দুবার চিকিৎসক এসেছেন। নার্স পাওয়া যায় না, ওয়ার্ডবয়ের দেখা মেলে না। মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. কামাল হোসেন সমকালকে বলেন, বিভাগে জনবলের ঘাটতি আছে। এ কারণে রোগীদের সন্তুষ্ট করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
গাইনি বিভাগ
গাইনি বিভাগে শয্যা তিন ইউনিট মিলে ১২০টি। গত ১৯ সেপ্টেম্বর রোগী ভর্তি ছিল ৪৩৬ জন। চিকিৎসক আছেন ১৩ জন, ইন্টার্ন ৬, নার্স ১৬, ওয়ার্ডবয় ৩ জন। চিকিৎসক প্রয়োজন ৩৯ জন, ইন্টার্ন ১৮, নার্স ৪৩, ওয়ার্ডবয় ১৬ জন। এই বিভাগে ভর্তি ফাতেমা বেগম বলেন, স্যালাইন খুলে গেলে নার্সদের ডেকেও পাওয়া যায় না।
বিভাগের প্রধান ডা. আকতারী হোসেন নিপা বলেন, চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় এবং ক্লিনারের সংকট আছে। জনবল অনুযায়ী সক্ষমতা আছে ১২০ জনের চিকিৎসার। কিন্তু রোগী ভর্তি থাকে চার গুণ। এ কারণে হিমশিম খেতে হয়।
শিশু বিভাগ
শিশু বিভাগে তিনটি ইউনিটে শয্যা ১৬০টি। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভর্তি ছিল ৪৩২ জন। চার শয্যার একটি কক্ষে হামের রোগী দেখা যায় ১২ জন। বিভাগে চিকিৎসক ১৩ জন, ইন্টার্ন ৭, নার্স ১৭, ওয়ার্ডবয় ২, ক্লিনার ২ জন। রোগী অনুপাতে চিকিৎসক ৩৮ জন, ইন্টার্ন ২২, নার্স ৫৪, ওয়ার্ডবয় ১৬ জন প্রয়োজন।
হামের রোগীর কক্ষে রাবেয়া আক্তার নামের এক নারী বলেন, চিকিৎসক ও নার্স দিনে-রাতে দু-তিনবারের বেশি আসেন না। শিশুর বেশি সমস্যা দেখা দিলে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কাউকে পেলেও বলে– ব্যস্ত আছি। নার্সদের সব সময় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। ডাকলে ক্ষেপে যান।
ওয়ার্ডের নার্সের ইনচার্জ সেলিমা ডেইজি বলেন, নার্সরা তিন শিফটে ডিউটি করেন। রোগীর তুলনায় নার্স কম থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।
সার্জারি বিভাগ
সার্জারি বিভাগে শয্যা ১৬০টি। গত ১৯ সেপ্টেম্বর রোগী ভর্তি ছিল ৪৩৮ জন। চিকিৎসক আছেন ১৫ জন, ইন্টার্ন ৭, নার্স ১৩, ওয়ার্ডবয় ১ জন। কিন্তু প্রয়োজন এর তিন গুণ জনবল। ওয়ার্ডবয় সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এই বিভাগে দুর্ঘটনা ও সংঘর্ষে আহত রোগী বেশি আসে। ট্রলির প্রয়োজন হয় বেশি। আমি একা সামাল দিতে পারি না। রোগীর স্বজনরা গালাগাল করে, গলাধাক্কা দেয়; চুপ করে সহ্য করি।’ ক্লিনার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি একা, অথচ ইউনিট পাঁচটি। পরিষ্কার করলেও এক ঘণ্টার মধ্যে আবার ময়লা জমে যায়। ২০ জনের জন্য তৈরি করা বাথরুম ব্যবহার করে অন্তত ২০০ জন।’
বহির্বিভাগের চিত্র
গত ২০ সেপ্টেম্বর বহির্বিভাগে একজন চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ডাক্তার আমার রোগীকে ভালো করে না দেখেই ওষুধ লিখে বিদায় করল। ডাক্তাররা শুধু সরকারের বেতন খায়, রোগী ঠিকমতো দেখে না।’
বহির্বিভাগের টিকিট বিক্রি অনুযায়ী এদিন রোগী আসে দুই হাজার ৯৭৪ জন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন রোগী আসে গড়ে তিন হাজার। বহির্বিভাগে ২০ জন চিকিৎসক আছেন। গড়ে তিনজন করে ছুটিতে থাকেন। একেকজন চিকিৎসক রোগী দেখেন ১৭০ জনের মতো।
শজিমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুর-ই-মোর্শেদ সমকালকে বলেন, হাসপাতালে দুদফায় শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হলেও জনবল বাড়ানো হয়নি। যে জনবল আছে, তাদের প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে হয়। বাড়তি চাপের কারণে এবং রোগীর স্বজনদের দাপটে অনেক সময় কর্মীরা মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন না। কখনও কখনও সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় নার্সদের মোবাইল না চালানোর নির্দেশ দেওয়া আছে। তবে প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করা ঠিক হবে না।