ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

চিলমারীতে পশু চিকিৎসার সংকট

‘ডাক্তার নেই, নদী পেরিয়ে সদরে যেতেই মরে যায় গরু-মহিষ’

‘ডাক্তার নেই, নদী পেরিয়ে সদরে যেতেই মরে যায় গরু-মহিষ’
×

ছবি: সমকাল/রিয়াদুল ইসলাম বাবু

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৫:০৭

উত্তাল ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে জীবন সংগ্রামের প্রধান হাতিয়ার গবাদিপশু। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার নদীবেষ্টিত তিনটি ইউনিয়নের চরাঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার পরিবার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া পালন করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন বুনছেন। অথচ পর্যাপ্ত সরকারি চিকিৎসাসেবার অভাবে এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে তাদের কষ্টার্জিত এই প্রাণিসম্পদ খাত। ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো স্থায়ী ভেটেরিনারি সার্জন বা প্রাণি চিকিৎসক না থাকায় রোগব্যাধি দেখা দিলে দ্রত চিকিৎসা পান না খামারিরা; ফলে প্রায়ই পশুর মৃত্যুতে সব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন চরাঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ।

উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের হিসাব অনুযায়ী, চরবেষ্টিত নয়ারহাট, অষ্টমীর চর ও চিলমারী ইউনিয়নে প্রায় ৯ হাজার ৬২৪টি পরিবার বাস করে। এসব পরিবারে প্রায় ২৯ হাজার ২৬০টি গরু-মহিষ, ২৮ হাজার ৯৭০টি ছাগল-ভেড়া এবং এক লাখ ১৪ হাজারেরও বেশি হাঁস-মুরগি রয়েছে। যদিও স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের দাবি, চরাঞ্চলের মাঠপর্যায়ে গবাদিপশুর প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ গবাদিপশুর সুরক্ষায় চরাঞ্চলে স্থায়ী কোনো সরকারি চিকিৎসা বা সেবা কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। সরেজমিন দেখা যায়, চরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে পাঁচ থেকে ১০টি গরু-মহিষ পালন করা হয়। কিন্তু কোনো পশু অসুস্থ হলে তাদের ছুটতে হয় মাইলের পর মাইল নদীপথ পেরিয়ে উপজেলা সদরে। বিশেষ করে বর্ষাকালে উত্তাল নদীতে পারাপার এবং রাতে ট্রলার বা নৌকা না থাকার কারণে জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় সদরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে ট্রলারের ওপর ঢলে পড়ে অসুস্থ পশুর প্রাণ।

চরের কড়াই বরিশাল গ্রামের খামারি জেল হক জোদ্দার আক্ষেপ করে বলেন, ‘গরু-ছাগল পাল্যাই আমাগো সংসার চলে। পশুডা অসুস্থ হইলে পাশে কোনো ডাক্তার পাই না। নৌকা ভাড়া কইরা সদরে নিতে নিতে পশুর অবস্থা শেষ হয়া যায়। একটা গরু মরা মানে আমাগো সংসারের মেরুদণ্ড ভাইঙা পড়া।’ একই সংকটের কথা জানান খামারি জমির আলী। তিনি জানান, বন্যা ও ভাঙনের সঙ্গে লড়াইয়ের পর পশুর রোগবালাই তাদের দেউলিয়া করে দিচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, স্থায়ী চিকিৎসকের অভাবে জরুরি চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান, কৃমিনাশক প্রয়োগ ও রোগ প্রতিরোধমূলক মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। বাধ্য হয়ে চরের মানুষ স্থানীয় অনভিজ্ঞ ‘হাতুড়ে’ ডাক্তারের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যা ভুল চিকিৎসায় পশুর মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ভুক্তভোগী খামারি কড়াই বরিশাল এলাকার খামারি আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমার ৯০ হাজার টাকা দামের গরুটার পেট ফুলে যায়। নৌকা না পেয়ে এটিকে সদরের পশু হাসপাতালে নিতে পারিনি। চরের এক হাতুড়ে ডাক্তার চিকিৎসা দিলেও বাঁচানো যায়নি। চরে যদি সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার থাকত, তবে আমার এই বড় ক্ষতিটা হইত না।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অফিসে অনুমোদিত ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র সাতজন, যার মধ্যে ৪টি গুরুত্বপূর্ণ পদই ফাঁকা। এই জনবল সংকট ও যোগাযোগব্যবস্থার জটিলতার কারণে চরাঞ্চলে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘চরের মানুষের আয়ের মূল ভিত্তি গবাদিপশু। সেই অবলম্বন অসুস্থ হলে চরবাসীর দুর্ভোগের শেষ থাকে না। তাই অনতিবিলম্বে ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পদায়ন করতে হবে। স্থায়ী চিকিৎসক না দেওয়া পর্যন্ত বিশেষ নৌ মেডিকেল টিমের মাধ্যমে চরাঞ্চলে পশুর টিকাদান ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বীরেন্দ্র নাথ রায় সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে জানান, সীমিত জনবল নিয়েও তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে চরাঞ্চলের প্রতিটি ইউনিয়নে স্থায়ী প্রাণি চিকিৎসক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় পদ পূরণ করা সম্ভব হলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

×