ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

চমেক হাসপাতালে আসার আগে ৮৪% মানসিক রোগী অপচিকিৎসার শিকার

চমেক হাসপাতালে আসার আগে ৮৪% মানসিক রোগী অপচিকিৎসার শিকার
×
×

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে আসার আগে ৮৪ শতাংশের বেশি মানসিক রোগী অপচিকিৎসার শিকার হয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, কুসংস্কার ও অপচিকিৎসার কারণে অনেক রোগীর চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়, জটিলতা বাড়ে। কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যুও ঘটতে পারে। 

গত ৯ মাসে হাসপাতালে ২২ হাজার মানসিক রোগী চিকিৎসা নেন। এ সময় প্রত্যেক রোগীর আগের কথিত চিকিৎসার বিস্তারিত রেজিস্ট্রারে লিখে রাখেন চিকিৎসকরা। এরপর পর্যালোচনায় মানসিক রোগীদের অপচিকিৎসার চিত্রটি উঠে আসে।   

গত ৬ অক্টোবর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডে কথিত চিকিৎসার নামে নির্যাতনে ১৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আবদুল্লাহর মৃত্যু হয়। পুলিশ জানায়, মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে সুস্থ করার আশায় বাবা নুর মোহাম্মদ কবিরাজের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কবিরাজের পরামর্শে প্রথমে ছেলেটিকে ঝাড়ফুঁক করা হয়। একপর্যায়ে ছেলেটির হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয় এবং মুখে লাঠিসদৃশ বস্তু ঢোকানো হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা নির্যাতনের পর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবাকে আটক করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কবিরাজ পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হচ্ছে। মানসিক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর দিনে চট্টগ্রামের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উদ্বেগজনক চিত্রটি সামনে এসেছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, মানসিক রোগের চিকিৎসায় কুসংস্কার ও অপচিকিৎসা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক রোগী প্রথমে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে কবিরাজ, ওঝা, বৈদ্য কিংবা অন্য কথিত চিকিৎসকদের কাছে যান। তারা রোগীকে তাবিজ, ঝাড়ফুঁক ও পানি পড়া দেন। এসব কথিত চিকিৎসায় শারীরিক বা মানসিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চমেক হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ মাসে প্রায় সাড়ে ২২ হাজার রোগী বিভাগটিতে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার রোগী আগে অপচিকিৎসা নিয়েছেন। অর্থাৎ, প্রায় ৮৪ শতাংশ রোগী অপচিকিৎসার শিকার। 

হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. পঞ্চানন আচার্য্য সমকালকে বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষই মনে করেন, মানসিক রোগ বলতে কিছু নেই, এটি জিন-ভূতের বিষয়। এ জন্য ডাক্তার দেখানো ও ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন না তারা। ফলে চিকিৎসার চেয়ে নানা অপচিকিৎসায় বেশি বিশ্বাস তাদের। ডাক্তার না দেখিয়ে স্থানীয় বৈদ্য, ওঝা, জ্যোতিষী ও কবিরাজের কাছে ছোটেন। এতে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও গুরুতর হয়।’

ডা. পঞ্চানন আচার্য্য আরও বলেন, ‘মানসিক রোগীদের সুস্থ করে তুলতে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অপচিকিৎসা। বিষয়টি নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। আক্রান্ত মানুষের তুলনায় দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র সাড়ে তিনশর মতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপের ভিত্তিতে বেসরকারি সংস্থা লাইট হাউসের তথ্য বলছে, মানসিক সমস্যায় ভোগা দেশের ৯১ শতাংশ মানুষ চিকিৎসাসেবা পান না। চিকিৎসাসেবার সীমিত প্রাপ্যতা এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম 
রোগীর চাপ বাড়লেও চট্টগ্রামে সরকারি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা সে অনুপাতে বাড়েনি। বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের জন্য চমেক হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র। বিভাগটিতে সরকার অনুমোদিত শয্যা ২৩টি। রোগীর চাপ সামলাতে সেখানে ৬০টি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এরপরও রোগীর চাপ

সামলাতে হিমশিম খেতে হয় সংশ্লিষ্টদের।
বিভাগটিতে অধ্যাপকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল অফিসারের তিনটি পদও শূন্য রয়েছে। পর্যাপ্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, নার্স ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকট রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য

আনসার সদস্যও নেই। চিকিৎসকদের মতে, প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতি মানসিক রোগীদের যথাযথ সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা।
কর্ণফুলী থানার ওসি নুর আহমদ বলেন, ‘কবিরাজের পরামর্শে কথিত চিকিৎসার নামে ছেলে আবদুল্লাহকে নির্মমভাবে অত্যাচার করেন বাবা। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা নির্যাতনের কারণে ছেলের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে।’

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন সমকালকে বলেন, বৃহত্তর চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানসিক রোগীর সংখ্যা। সে হারে বাড়ছে না চিকিৎসার সহজলভ্যতা। পুরো চট্টগ্রামের মানুষের ভরসা কেবল চমেকের মনোরোগ বিভাগটি। তবে বিভাগটিতে চিকিৎসক, নার্সসহ পর্যাপ্ত জনবলের সংকট প্রকট। 

তসলিম উদ্দীন বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে মানসিক রোগের চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় এ অঞ্চলের ফেনী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, রাঙামাটি, বান্দরবানসহ অনেক প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। যে কারণে বহির্বিভাগ ও অন্তবিভাগে সবসময় রোগীর বাড়তি চাপ থাকে। জনবল সংকটসহ যাবতীয় বিষয় জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি।’

আরও পড়ুন

×