ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

স্কুলে মনোবিদ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এখন সময়ের দাবি

চট্টগ্রামে গোলটেবিল বৈঠক

স্কুলে মনোবিদ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এখন সময়ের দাবি
×
×

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক। ছবি: সমকাল

চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৩৬ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৫০

বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্কুল পর্যায় থেকেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসক, শিক্ষক, পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীসহ বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা এবং পাঠ্যক্রমে মনোবিজ্ঞান বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘জীবনের অভিজ্ঞতার কণ্ঠস্বর শুনি: বাস্তব কণ্ঠস্বর, বাস্তব পরিবর্তন’ প্রতিপাদ্যে চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ এ বৈঠকের আয়োজন করে।

মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. পঞ্চানন আচার্য্যের সভাপতিত্বে বৈঠকে বক্তব্য দেন চমেকের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জসিম উদ্দিন, চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. তসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোয়েব উদ্দিন খান, চমেকের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আনিসুল হোসেন, মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সাত্তার, শিশুরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. বেলায়েত হোসেন ঢালী, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বাসনা মুহুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আরিফুল ইসলাম, মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজনীন সরকার, চট্টগ্রাম কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হাসিব আল মাহমুদ এবং ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহেদা আক্তার প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানদের দূরত্ব বাড়ছে। ফলে অনেক সন্তান নিজেদের মনের কথা মা-বাবার কাছে বলতে পারছে না। এতে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। অন্যদিকে, জিপিএ-৫ পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ছে। মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে, এমনকি পরীক্ষার হল ছেড়ে চলে যেতে চাইছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে মনোবিজ্ঞান বিষয়টি যুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য যথাযথ কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ে স্থায়ী কাউন্সেলর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী তাঁর বক্তব্যে পুলিশ সদস্যদের নানা ধরনের মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন। পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা পরামর্শ দিতে চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। চসিকের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোয়েব উদ্দিন খান বিবাহবিচ্ছেদের কারণে সৃষ্ট মানসিক সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। এ ছাড়া অটিজম নিয়ে নিজের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. বাসনা মুহুরী।

অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন সমকালের নিজস্ব প্রতিবেদক শৈবাল আচার্য্য। তিনি বলেন, বিজ্ঞানের এই যুগেও অনেক মানুষ তাবিজ, কবিরাজ, বৈদ্য ও ওঝার মতো অপচিকিৎসার ওপর নির্ভর করছেন, যা উদ্বেগজনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসব পদ্ধতির কোনো ভিত্তি নেই। গত ৬ অক্টোবর চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে অপচিকিৎসা করাতে গিয়ে বাবার হাতে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ নামে এক প্রতিবন্ধী ছেলের মৃত্যু হয়। অপচিকিৎসার শিকার হয়ে অনেক সুস্থ মানুষও মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সচেতনতার অভাবেই এমন ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শৈবাল আচার্য্য আরও বলেন, সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে সচেতন করতে সরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরও স্থানীয় পর্যায়ে মানসিক রোগের চিকিৎসা পাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হয়নি।

চমেকের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চিত্র তুলে ধরে বিভাগীয় প্রধান ডা. পঞ্চানন আচার্য্য বলেন, বহির্বিভাগে প্রতিদিন ১০০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নেন। তাঁদের মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ জনই এখানে আসার আগে বিভিন্ন জায়গায় অপচিকিৎসা নিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে মানসিক রোগীদের সুস্থ করে তোলার পথে অপচিকিৎসা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, বৃহত্তর চট্টগ্রামের কয়েক কোটি মানুষের মানসিক রোগের চিকিৎসার ভরসা চমেক হাসপাতালের ছোট বিভাগটি। ওয়ার্ডে সরকার অনুমোদিত শয্যা রয়েছে মাত্র ২৩টি। রোগীর চাহিদা বিবেচনায় সেখানে ৬০টি শয্যা বসানো হয়েছে। এরপরও রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের হিমশিম খেতে হয়।

ডা. পঞ্চানন আচার্য্য জানান, বিভাগে অধ্যাপকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার একজন চিকিৎসক। গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল অফিসারের তিনটি পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। পর্যাপ্ত মনোরোগবিদ ও নার্সের সংকট রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য নেই আনসার সদস্য। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও প্রকট।

তিনি আরও বলেন, মানসিক রোগীদের মধ্যে কখনো ভাঙচুর, মারামারি, উচ্চস্বরে কথা বলা ও অস্বাভাবিক আচরণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু পর্যাপ্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী না থাকায় প্রায়ই বিশৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

×