শৈশবের বিদ্যালয়ে বাবার সহকর্মী
ধর্মপাশার নোয়াবন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পাশাপাশি বাবা ও ছেলে সমকাল
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাবার হাত ধরে যে বিদ্যালয়ে শুরু হয়েছিল শৈশবের প্রথম পাঠ, যে বিদ্যালয়ের আঙিনায় শিক্ষাজীবনের শুরুর দিনগুলো কাটিয়ে ছিলেন, সময়ের পরিক্রমায় সেই বিদ্যালয়ে ফিরলেন ছেলে। তবে এবার শিক্ষার্থী হিসেবে নয়, বাবার সহকর্মী হয়ে।
সম্প্রতি বাবা-ছেলের এমন আবেগঘন মুহূর্তের অবতারণা হয়েছে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার নোয়াবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাবা-ছেলের এমন বিরল মুহূর্তের ছবিও ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
উপজেলা সদরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা জাকির হোসেন নোয়াবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। ২০২৫ সালের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তাঁর ছেলে তোয়াসিন আহমেদ। নবনিযুক্ত তোয়াসিনকে পাঁচ দিনের জন্য সংযুক্ত করা হয়েছে তাঁর বাবার কর্মস্থল নোয়াবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
গত রোববার তিনি এ বিদ্যালয়ে সংযুক্ত হন। এই পাঁচ দিন একই বিদ্যালয়ে সহকর্মী হিসেবে পাঠদান করবেন বাবা ও ছেলে। এরপর তোয়াসিন যোগ দেবেন ঘিরইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সময়টা সংক্ষিপ্ত হলেও এই পাঁচ দিনের স্মৃতি তাদের জীবনের এক বিরল অর্জন– এমনটাই বলছে পরিবার।
তোয়াসিন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ে ২০২৪ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষক হিসেবে তাঁর নতুন পথচলা শুরু হয়েছে। সেই পথচলার শুরুতেই বাবার কর্মস্থলে তাঁর সহকর্মী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে; যা বাবা-ছেলের দুজনের মনেই আনন্দ ও আবেগের জন্ম দিয়েছে। যে বিদ্যালয়ে একদিন বাবা শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ছেলের শৈশবের শিক্ষাজীবন দেখেছেন, সে বিদ্যালয়েই আজ দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে যুক্ত হয়েছেন।
নব নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক তোয়াসিন আহমেদ বলেন, বাবার হাত ধরে এক সময় এ বিদ্যালয়ে পড়তে আসতাম। আজ শিক্ষক হিসেবেও বাবার সঙ্গে এ বিদ্যালয়ে এসেছি। এই অনুভূতি বলে বোঝানোর মতো নয়। শিক্ষকতা জীবনের শুরু বাবার সঙ্গে হওয়ায় তিনি দারুণ আনন্দিত।
তোয়াসিনের বাবা সহকারী শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, বাবা হিসেবে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন। তোয়াসিন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তার স্নাতক সম্পন্ন হওয়ার পরপরই এ নিয়োগ পরীক্ষাটি হয়েছিল। আশা করি, তার পদায়নকৃত বিদ্যালয়ে সর্বোচ্চটুকু দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, বাবা-ছেলের এই পথচলা কেবল একটি পরিবারের আনন্দের গল্প নয়; এটি স্মৃতি, ভালোবাসা, গর্ব আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য মুহূর্ত। এ যেন শিক্ষা প্রসারে একটি প্রজন্মের হাত বদলের লগ্ন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হুসনে আরা বলেন, তোয়াসিন আহমেদের এ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এক সময় যে বিদ্যালয়ে বসে শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ নিয়েছেন, আজ সে বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন তিনি। এটি সত্যিই গর্বের।
প্রধান শিক্ষক সুফিয়া খাতুন বলেন, তোয়াসিনের কাছে এই পাঁচ দিন কেবল কর্মজীবনের শুরুর সময় নয়, শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয়ে বাবার সহকর্মী হয়ে থাকার এক বিশেষ অভিজ্ঞতা।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তিনি অত্যন্ত আনন্দিত এমন একটি ঘটনার অংশ হতে পেরে। বাবা ও ছেলের একই সঙ্গে একই কর্মস্থলে কাজ করা এক বিরল ঘটনা। বর্তমান সরকারের সংযুক্তি প্রদানের এ ব্যবস্থা এক বিরল এবং সুখময় ঘটনার জন্ম দিয়েছে।
- বিষয় :
- শৈশব