পতনের ধারায় রপ্তানি আয় ডিসেম্বরে কমেছে ১৪%
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:৩৯
রপ্তানিতে স্থবিরতা কাটছেই না। টানা পাঁচ মাস কমলো রপ্তানি আয়। সদ্য সমাপ্ত বছরের ডিসেম্বর মাসে গত বছরের একই মাসের চেয়ে ডিসেম্বের রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ৩৯৭ কোটি ডলারেরও কিছু কম।
গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয় এসেছে প্রায় দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ছয় মাসের এই রপ্তানি গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ কম। অথচ গত অর্থবছরের এই সময়ে তার আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি ১৩ শতাংশ বেশি হয়েছিল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল রোববার রপ্তানির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের চেয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রপ্তানি কমলেও গত নভেম্বরের চেয়ে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ। এই প্রবণতা গত নভেম্বরে শুরু হয়। ওই মাসে অক্টোবরের চেয়ে রপ্তানি ২ শতাংশ বেশি হয়। আগের মাসের চেয়ে পরপর দুই মাস রপ্তানি বাড়ার এই প্রবণতার মধ্যেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার একটি কারণ, গত বছরের এই দুই মাসের রপ্তানিতে মজবুত ভিত্তি। গত বছর এই দুই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রপ্তানি হয়। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশ। ডিসেম্বরে আরও বেড়ে হয় ১৮ শতাংশ।
রপ্তানি খাতের সবশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এবং জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক হাসান গতকাল সমকালকে বলেন, অনেক কারণে রপ্তানি চিত্রের এই হতাশাজনক প্রবণতা চলছে। প্রথমত, মার্কিন পাল্টা শুল্কের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন এসেছে তাতে অনেক দেশেই চাহিদা কমেছে। বিশেষ করে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ভোক্তা পর্যায়ে ভোগ-ক্ষমতা কমেছে। এ কারণে সেখানে শুধু বাংলাদেশের রপ্তানিই কমেনি, বরং সব দেশেরই রপ্তানি কমছে। এর বাইরে অন্য বড় কারণের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়া। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন গত বছরের ৪ জানুয়ারি তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির জন্য বাংলাদেশকে দেওয়া দীর্ঘ দিনের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে ভারত। এ কারণে ভারতীয় স্থল শুল্ক স্টেশন ব্যবহার করে বন্দর এবং বিমানবন্দর দিয়ে তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না বাংলাদেশ। এ কারণে রপ্তানিতে লিড টাইম অর্থাৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পণ্য উৎপাদন করে তাদের কাছে পৌঁছানোর সময় আরও বেড়ে গেছে। এ কারণে কিছু ক্রেতা হারিয়েছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ভারত স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। কারণ স্বল্প লিড টাইমের উচ্চ মূল্যের পণ্য উৎপাদন এতে কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। সাধারণত উচ্চ মূল্যের পণ্য রপ্তানি আদেশে পরিমাণে কম পণ্য থাকে। তবে দ্রুত সরবরাহ করতে হয়। পরিমাণে কম হওয়ায় ভারত থেকে সহজেই স্বল্প পরিমাণে সুতা আমদানি করে পণ্য উৎপাদন করে দ্রুত রপ্তানি করা যেত। সেই সুযোগ এখন আর নেই। এ কারণেও কিছু ক্রেতা আমরা হারিয়েছি। গ্যাস, বিদ্যুতের পুরোনো সংকটের সঙ্গে শ্রমিকদের ৯ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্টসহ আরও কিছু কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে সক্ষমতা কমছে। শিগগিরই রপ্তানি খাতের এ পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
চলতি অর্থবছরের গত ৬ মাসের রপ্তানি প্রবণতা থেকে দেখা যায়, অর্থবছরের দ্বিতীয় মাসে আগস্ট মাস থেকেই পণ্য রপ্তানি কিছুটা হোঁচট খায়। আগস্টে আয় কমে যায় ৩ শতাংশের মতো। তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরেও সেই ধারা দেখা যায়। মাসটিতে রপ্তানি কমে যায় ৫ শতাংশের মতো। অক্টোবর মাসে রপ্তানি কমে ৭ শতাংশ। নভেম্বরে রপ্তানি আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় কম হয় ৬ শতাংশ। অবশ্য অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি ২৫ শতাংশ বেড়েছিল।
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই মাসে রপ্তানিতে অনেক ভালো প্রবৃদ্ধির কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত কারখানায় রাতদিন কাজ চালিয়ে পণ্য জাহাজীকরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন উদ্যোক্তারা। ব্র্যান্ড-ক্রেতারাও বাড়তি শুল্ক এড়াতে আগাম আমদানিতে আগ্রহী ছিল। এ কারণে ওই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রপ্তানি হয়। গত ৩১ জুলাই ওয়াশিংটনের ঘোষণা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা ২০ শতাংশ শুল্ক ৭ আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিটে কার্যকর হয়।
ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে তৈরি পোশাক ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি কমছে। এর মধ্যে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি কমেছে ১০ শতাংশের মতো। কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে সবচেয়ে বেশি, ২৮ শতাংশ।
- বিষয় :
- রপ্তানি বাণিজ্য
- রপ্তানি
