শরৎকাল
'কোন্ অতিথি এল প্রাণের দ্বারে'
শরতের নির্মল আকাশ। আবহমান বাংলার নৈসর্গিক রূপ -সমকাল
সাজিদা ইসলাম পারুল ও লতিফুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২২ | ১৪:২২
আকাশের নীল চত্বরে তুলোর মতো মেঘ; পাহাড়ের ঢালে, নদীর চরে সাদা কাশফুল। পুকুরে, ডোবায়, হাওরে-নদীতে স্ম্ফটিক জলের প্রবাহ। চারদিকে সতেজ প্রকৃতি। সব মিলিয়ে বাংলা বছরের তৃতীয় ঋতু শরৎ যেন অনন্য। শ্রাবণ শেষে আজ মঙ্গলবার ভাদ্রের প্রথম দিন। সেসঙ্গে 'বৃষ্টিহীন' বর্ষা শেষে শুরু 'কাশফুলের ঋতু'র।
শরতে গ্রামগঞ্জে ভরা চাঁদের আলোয় ক্ষেতে বাড়ন্ত ধান অপরূপ দেখায়। চোখে পড়ার মতো সৌন্দর্য দেখা যায় খোলা মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, হাওর ও বিলে। প্রকৃতিপ্রেমীরা এ ঋতুর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছরের মতো এবারও ছুটছেন নদী-নালা, খাল-বিলের কিনারে। তাঁরা দেখবেন হাওরের স্বচ্ছ জল, আর আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ; মুহূর্তেই অভিমানে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার দৃশ্য।
'ফ্লামিঙ্গো' নামক একটি গ্রুপের ১৬ সদস্য এরই মধ্যে গিয়েছিলেন সিলেটের টাঙ্গুয়ার হাওরে। তাঁদের একজন তানভীর আহমেদ জানান, প্রকৃতিতে অন্য এক স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে। নিজের চোখে হাওরের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখেছি। সেখানে বিশুদ্ধ বাতাস, সঙ্গে এই রোদ এই বৃষ্টি। রাজধানীবাসীও ছুটির দিনগুলোতে ছুটছেন পার্শ্ববর্তী খাল-বিলের তীরে।
শরৎ মানেই শুভ্রতা, স্নিগ্ধতা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রিয় শরৎকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছিলেন- 'আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা/নবীন ধানের মঞ্জরি দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা/এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,/এসো নির্মল নীলপথে...'। কবিগুরুর বর্ণনার সঙ্গে এখন মিলে যায় সব। কাশফুল শেফালিমালা নবীন ধানের মঞ্জরি এখন দৃশ্যমান হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ফুটেছে সুগন্ধি শিউলিও। প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে শিউলি ফুল খুব আকৃষ্ট করেছিল। শরৎ দেখতে গিয়ে শিউলি, আর শিউলি দেখতে গিয়ে শরৎ দেখেছেন তিনি। মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন- 'এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি-বিছানো পথে।/এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে...'। অন্যত্র কবির উচ্চারণ- 'শিউলিতলায় ভোর বেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।/শেফালি পুলকে ঝ'রে পড়ে মুখে খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা...'।
শরৎ শুধু প্রকৃতিতেই পরিবর্তন আনে না। বদলে দেয় মানুষের মনও। সেই পরিবর্তনের কথাও কবিগুরুর কাব্যে রয়েছে। কবিগুরু লিখেন- 'শরতে আজ কোন অতিথি এল প্রাণের দ্বারে।/আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে...'। তার মানে, আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে শরৎ। মনকে ভরিয়ে রাখে। নাকি কিছু লুকানো বেদনাও হৃদয় খুঁড়ে তুলে আনে শরৎ? তা না হলে নজরুল কেন লিখবেন- 'শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথি কই...'। একই রকম বিরহের প্রকাশ ঘটিয়ে অন্যত্র কবি লিখেন- 'দূর প্রবাসে প্রাণ কাঁদে আজ শরতের ভোর হাওয়ায়।/শিশির-ভেজা শিউলি ফুলের গন্ধে কেন কান্না পায়...'। আকুতি শোনা যায় কবিগুরুর কণ্ঠেও।
কেবল এ দুই কবিই নন, বাংলা ভাষার অন্য কবিদের কবিতায়ও শরতের চিত্র সমানভাবে ফুটে উঠেছে। জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতায় শরতের প্রসঙ্গ এসেছে। যেমন- 'এখানে আকাশ নীল- নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল/ ফুটে থাকা হিমশাদা- রং তার আশ্বিনের আলোর মতন'।
প্রকৃতিবিষয়ক সংগঠন 'তরুপল্লব'-এর সাধারণ সম্পাদক গবেষক মোকারম হোসেন সমকালকে বলেন, এ বছর প্রায় বৃষ্টিহীন বর্ষাকাল গেল। আগের মতো শরৎ ঋতুর সূচনাও জাঁমজমকপূর্ণভাবে হয়নি। যেমনটা আমরা দেখে এসেছি। নগরে-গ্রামে কোথাও শরৎ ঋতুর প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠেনি। এর অন্যতম কারণ বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রভাব। তিনি জানান, শরতের ফুল মূলত তিনটি- কাশ, শিউলি ও দুই রঙের পদ্ম (সাদা ও গোলাপি)। এ ছাড়া শরতের শেষ দিকে ফোটে ছাতিম। তবে ছাতিম শরৎ ও হেমন্তের মাঝামাঝিতেই বিকশিত হয়। আরও ফোটে কলমি ফুল। কৃৃষ্ণচূড়া ফুলও ফোটে। বর্ষার জমে থাকা পানি কমে যাওয়ায় জলজ ফুলগুলোর সৌন্দর্য বিকশিত হয়। এসব ফুলের মধ্যে রয়েছে- হলুদরঙা সোনাইল বা বান্দরলাঠি, বিলিতি জারুল, শ্বেতকাঞ্চন, এলামেন্ডা, কামিনী, মাখনা, দইগোটা। আর চা-ফুল তো আছেই। দু'চারটি গন্ধরাজও থাকবে। ফুরুসও (চেরি) থাকবে এ সময়টায়। ফলের মধ্যে রয়েছে আমলকী ও জলপাই।
- বিষয় :
- শরৎকাল
- কোন্ অতিথি