বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত
দুই দেশের দৃঢ় বন্ধুত্বের মধ্যেও কেন এত গুলি?
ছবি: দ্য ডিপ্লোম্যাট
ইয়াজিম পলাশ
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৪ | ১৬:৫৫ | আপডেট: ০৪ মার্চ ২০২৪ | ১৭:০২
ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। তাহলে, কেন ভারতীয় সৈন্যরা এত ঘন ঘন সীমান্তে প্রাণহানি ঘটায়, গুলি করে?
২০১৮ সালের এপ্রিল মাসের এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন। অন্য দিনের মতো সেদিনও ১৪ বছর বয়সী রাসেল মিয়া তার কৃষক বাবা হানিফ উদ্দিনের সঙ্গে ক্ষেতে কাজে গিয়েছিলেন। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তে নো ম্যানস ল্যান্ডের পাশেই তাদের জমি। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে কাজ গুটিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন হঠাৎ করেই বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) দুই সদস্য তাদের দিকে ছুটে আসেন।
‘আমি গরুর দড়ি ধরেছিলাম তখন। আমি তাদের ছু্টে আসতে দেখে ভয়ে লুঙ্গি আর টি-শার্ট পরা অবস্থায় দৌঁড়াতে শুরু করি। গরু নিয়ে ছুটতে ছুটতে একসময় আমি নদীতে ঝাঁপ দেই। তখন একজন বিএসএফ সদস্য আমার ওপর রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।’ বর্তমানে ২০ বছর বয়সী রাসেল মিয়া কূটনীতিককে সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন। তিনি এখন লালমনিরহাটর উত্তর বাংলা কলেজে দর্শন বিভাগে স্নাতকে পড়ছেন।
তিনি বলেন, ‘বুলেট ছোড়ার পর কয়েক মিনিটের জন্য আমি কিছুই দেখতে পাইনি। আর এখন পর্যন্ত আমি ডান চোখে কিছুই দেখতে পারিনা।’
‘বিএসএফ দাবি করেছে- আমি নাকি কাঁটাতারের বেড়া কেটেছি। একজন ১৪ বছরের কিশোর কীভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া কাটতে পারে? বাড়ি ফেরার পর মাঠে আমাদের সঙ্গে যারা কাজ করছিলেন তাদের কাছ থেকে জানতে পারি যে বিএসএফ সদস্য আমার ওপর গুলি চালিয়েছে তিনি মাতাল ছিলেন।’
সেই সময় রাসেল মিয়ার ওপর বিএসএফের এনকাউন্টারের ঘটনা মিডিয়াতে বেশ আলোচিত ছিল। রাসেলকে তখন তার পরিবার কাছের একটি হাসপাতালে চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক মাসব্যাপী ভর্তি ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরে পাননি।

এই ঘটনার পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা রাসেল মিয়ার পরিবারকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বিএসএফ সদস্যকে বিচারের আওতায় আনা হবে এবং তাকে দিল্লির একটি হাসপাতালে আরও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেবে ভারত সরকার। দুবার ভারতে গিয়ে চিকিৎসককে দেখানোর পরও রাসেল তার চোখে দেখতে পায়নি।
‘এর দুই বছর পর করোনা মহামারির কারণে যখন লকডাউন কার্যকর করা হয়েছিল, তখন আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর থেকে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি।’ বলেন রাসেল
তিনি বলেন, আমি এখনও জানিনা সেই বিএসএফ সদস্য শাস্তি পেয়েছেন কিনা। তার কারণে অন্ধত্ব ছাড়াও এখন আমাকে জ্বর, মাথাব্যথা এবং আরও অনেক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে হয়।’
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম সীমান্ত। এটি বাংলাদেশের ছয়টি বিভাগ এবং ভারতের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, মিজোরাম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরা রাজ্যগুলিকে বিভক্ত করেছে। এই সীমান্ত এখন নানা সমস্যার বিষয় হয়ে উঠেছে। যেমন: চোরাচালান, অবৈধ অভিবাসন, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন। এছাড়াও বেশ কিছু ছিটমহলও রয়েছে। ২০১৫ সালে ভারত-বাংলাদেশ ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় করেছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে দৃঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। তাছাড়াও এই দুই দেশের মধ্যে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সাধারণ মূল্যবোধেরও অনেক মিল রয়েছে। এমনকি যুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল ভারত। সেসময় এক কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল তারা।
এরপর প্রায় পাঁচ দশক ধরে উভয় দেশ তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদারের জন্য আন্তরিকভাকে কাজ করে যাচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে নিয়মিত উচ্চ-পর্যায়ের আদান-প্রদান এবং সফর একটি ধারাবাহিক বিষয়। যা তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ ভারতের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব রাখে।
তবে এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে গত এক দশকে কিছুটা ভাটা পড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বিরোধী মনোভাবের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত সরকারের প্রভাব নিয়ে।
ভালো সম্পর্ক সত্ত্বেও এত গুলি কেন?
এত কিছুর মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা ও সহিংসতায় পরিপূর্ণ। বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে বিএসএফের হাতে মোট ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। যা প্রতি বছর গড়ে ৩০ জন।
অন্য আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে কমপক্ষে ১২৩৬ বাংলাদেশি নিহত এবং ১১৪৫ জন আহত হয়েছেন।

ড. মোহাম্মদ আবদুর রবের ‘বাংলাদেশ: ভূগোল, ভূ-রাজনীতি এবং পরিবেশ’ এর তথ্য অনুয়ায়ী ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে ২০৬ জন বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
তবে এসব বেশিরভাগ হত্যার ঘটনার কারণ হিসেবে বিএসএফ বলেছে, গরু, মাদক, অস্ত্র এবং অন্যান্য পণ্যের অবৈধ পরিবহন বা চোরাচালানের সময় অভিযান চালানো হয়েছে।
ফেলানী হত্যা: একটি নৃশংস ঘটনা
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামের নুরুল ইসলাম পরিবার নিয়ে থাকতেন ভারতে দিল্লিতে। মেয়ে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয় বাংলাদেশে। বিয়ে দিতে ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি মেয়েকে সঙ্গে করে আসেন অনন্তপুর সীমান্তে। ৭ জানুয়ারি ভোরে দালালের মাধ্যমে ফুলবাড়ী অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে কাঁটাতারের ওপর মই বেয়ে নামার সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় ফেলানীর। দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে থাকে তার মরদেহ। আলোচিত এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বিচার পায়নি তার পরিবার।

কুড়িগ্রাম সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীর লাশের ছবি আলোড়ন তুলেছিল দেশে-বিদেশে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু তাদের বিশেষ আদালতে অভিযুক্ত অমিয় ঘোষ দোষ স্বীকার করলেও বেকসুর খালাশ পেয়েছেন। পরে ভারতীয় মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) মাধ্যমে ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। কয়েক দফা শুনানির দিন পিছিয়ে এখনও আদালতেই ঝুলে আছে পিটিশনটি। বিচারিক কাজ বিলম্বিত হলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রত্যাশা বিশিষ্টজনদের।
ফেলানীর বাবা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ফেলানীকে সঙ্গে করে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় আমার চোখের সামনে বিএসএফ আমার মেয়েকে হত্যা করেছে। পরে আমি জেনেছি, অমিয় ঘোষ নামে একজন বিএসএফ সদস্য ফেলানীকে গুলি করার কথা স্বীকার করেছে। অথচ আদালত তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। আমি দুই বার ভারতে গিয়ে স্বাক্ষ্য দিয়েছি, ন্যায় বিচার চেয়েছি, অথচ তারা সঠিক বিচার করেনি। আমি অমিয় ঘোষের ফাঁসি চাই। আমি চাই ভারত সরকার যেন আমার মেয়ের সঠিক বিচারটা করে। কারণ আমার মেয়ে হত্যার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমি মরলেও আমার আত্মা শান্তি পাবে না।’

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী দক্ষিণ জেলা যশোরের জলপাড়ায় বিএসএফের হাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সৈনিক মোহাম্মদ রইসুদ্দিন নিহত হন।
এদিকে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী- বিএসএফ এর গুলিতে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী- বিজিবির এক সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত বিজিবি সদস্যের নাম সিপাহী মোহাম্মদ রইশুদ্দীন। যশোর বিজিবির ধান্যখোলা বিওপি’র জেলেপাড়া পোস্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার ছয়দিন পরই লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিএসএফের গুলিতে ৩৪ বছর বয়সী বাফিউল ইসলাম টিকলু নিহত হন।
বিএসএফ শুধু বাংলাদেশি বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাই করছেই না, প্রতিবছর অনেক বেসামরিক নাগরিকদের অপহরণ ও নির্যাতনও করেছে বলে তথ্য রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫০০ বেসামরিক নাগরিককে অপহরণ করেছে বিএসএফ। কেবল ২০১৩ সালেই ১৭৫ জন বেসামরিক নাগরিককে অপহরণ করা হয়েছিল যাদের মধ্যে মাত্র ৪৯ জনকে ফিরিয়ে এনেছে বিজিবি। বাকি ১২৬ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
সীমান্তে হত্যা বন্ধ হয় না কেন?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে।
সীমান্তে হত্যা বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালের এপ্রিলে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয় দুই দেশের মধ্যে। সেখানে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনায় প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার না করতে একমত হয় দুই দেশ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন দেখা যায়নি সীমান্তে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ এন এম মুনীরুজ্জামান বলেছেন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক ইচ্ছার ঘাটতি।
‘এটা বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা নাই। কারণ সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে, সেখান থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে এটা আর হবে না। কিন্তু একজন প্রাক্তন সৈনিক হিসাবে আমি বলতে পারি, যদি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পরিষ্কার আদেশ থাকে, তাহলে অবশ্যই সেটা না মানার অবকাশ নেই।’
তিনি বলেন, ‘বাইরে আমরা যেটাই শুনতে পাই, সীমান্তরক্ষীদের কাছে সেই ধরণের কড়া আদেশ নিশ্চয়ই পৌঁছে নাই। তারা যদি নির্দেশ দিয়ে থাকতো, সেটা যদি অমান্য হতো, তাহলে সেটার জন্য তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় নিশ্চয়ই জবাবদিহি করতে হতো। সেরকম কিছুও আমরা শুনি না বা প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই না।’

বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমি মনে করি কূটনীতিই কেবল সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে পারে। সীমান্তে হত্যা বন্ধের জন্য ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা প্রয়োজন। দুঃখজনকভাবে এটির ব্যাপক অভাব রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার অনেক কিছুই করতে পারে না বা করবে না। আমার কাছে মনে হয় ‘সীমান্ত হত্যা’ এজেন্ডা বাংলাদেশ সরকারের এজেন্ডায় নেই। কখনও কখনও মনে হয়েছে বাংলাদেশ পরোক্ষভাবে ভারতীয় হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করছে। তথাকথিত আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি জোর দিয়েছে।’
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট
