ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

শোকজের জবাব দিলেন স্বাস্থ্যের ডিজি

শোকজের জবাব দিলেন স্বাস্থ্যের ডিজি
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাবেক সচিব আসাদুল ইসলামের মৌখিক নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।
এর আগে গত শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, 'মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।' এ বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তিন কর্মদিবস সময় দিয়ে ডিজির কাছে 'ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে কী বুঝানো হয়েছে' তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এর জবাবে গতকাল বুধবার ডা. আবুল কালাম আজাদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষকে এ তথ্য জানান। দুপুর ১২টার দিকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নানের কাছে লিখিত আকারে ডিজি ব্যাখ্যা জমা দেন।
লিখিত ব্যাখ্যার বিষয়ে গণমাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে ডিজির লিখিত জবাব পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, 'মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিখিত জবাব দিয়েছেন। আমরা সেটি পেয়েছি। তার উত্তরের সঙ্গে তিনি অনেক কাগজ সংযুক্তি দিয়েছেন। সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে। দেখা হবে, তার কাছে যা জানতে চাওয়া হয়েছে, সেগুলো তার জবাবে আছে কিনা। উত্তরে সন্তুষ্ট হলে আমরা লিখিতভাবে জানাব। সন্তুষ্ট না হলে ব্যবস্থা নেব, তাও আপনারা জানবেন।'
স্বাস্থ্যসেবা সচিব বলেন, 'রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তির লিখিত আদেশ এই ব্যাখ্যার সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে কিনা মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের কাছে তা জানতে চেয়েছিলাম। তিনি জানিয়েছেন, সাবেক স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলামের মৌখিক নির্দেশে ওই চুক্তি করা হয়েছিল। বিস্তারিতভাবে সব কিছু জানার জন্যই তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এগুলো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে।'
যার মৌখিক নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কভিড-১৯ চিকিৎসার বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে, সেই আসাদুল ইসলাম বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ডিজির অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে গতকাল আসাদুল ইসলামকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চেয়ে তার মুঠোফোনে খুদেবার্তাও পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি।
মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, কারও মৌখিক নির্দেশে অফিসিয়াল চিঠি ইস্যু করা যায় না। অফিসিয়াল চিঠির একটি দালিলিক প্রমাণ থাকে। কিন্তু মৌখিক নির্দেশের সে ধরনের কোনো প্রমাণ থাকে না। কাগজে-কলমে যাদের স্বাক্ষরে কাজটি হয়েছে, এই দায় তাদেরই বহন করতে হবে।
করোনার নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসায় জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালে প্রতারণার দায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি বন্ধ করে দেয়। ওই দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার মো. সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতারক এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়, 'স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তির আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ তাকে চিনতেন না, পরিচয় থাকা তো দূরের কথা।'
জেকেজির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করে, 'প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সমন্বয়ক আরিফুল চৌধুরী ওভাল গ্রুপ লিমিটেড নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের স্বত্বাধিকারী। ওভাল গ্রুপ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে স্বাস্থ্য সেবা সপ্তাহ ২০১৮-এর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করে। ওভাল গ্রুপের সঙ্গে আগে থেকেই কাজের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তাদের অনুমতি দেওয়া যায় বলে মনে করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়। কিন্তু পরে প্রতারণার অভিযাগ পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জেকেজি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে।'
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের এই মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে সবখানে আলোচনা-সমালোচনা হয়। এর মধ্যেই গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) অনুরোধে তিনি রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, 'ডিজি অফিসে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের একটি সভায় গিয়েছিলাম। সঙ্গে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা ছিলেন। অন্যান্য ব্যক্তিও ছিলেন। সেদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজির অনুরোধে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তির অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। ডিজি বলেছিলেন, আপনারাও একটু থাকেন, রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হবে দুপুরের খাবারের পর। তাই আমরাও সেখানে ছিলাম। আমরা খুশি ছিলাম যে, একটি নতুন হাসপাতাল এলো, করোনার চিকিৎসা দেবে। প্রাইভেট হাসপাতাল তখন করোনা চিকিৎসা দিতে দ্বিধা করছে। কিন্তু তারা এসে সই-স্বাক্ষর করল, আমরাও খুশি হলাম।'
জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের বিষয়ে তিনি বলেন, 'জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটুকু হয়েছে, তা সরকার খতিয়ে দেখছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের কঠোর বিচার হবে এবং তাদের প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুটি সংস্থাকে কিছু কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যদি অন্যায় কাজ করে থাকে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দায়ী। তবে সেই হাসপাতালকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কিছু প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়াগুলো পালন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেই প্রক্রিয়া পালন করে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সই করেছে।'
জাহিদ মালেক বলেন, 'পরবর্তীকালে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা দুর্ভাগ্যজনক, ন্যক্কারজনক। যে কাজ করেছে, অন্যায় করেছে। তাই আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে। সেই অনুয়ায়ী শাস্তিও হবে।'
মন্ত্রী বলেন, 'মন্ত্রণালয় কোনো নির্দেশনা দিলে তা ফাইলেই থাকবে। ব্যাখ্যা (ডিজির কাছে চাওয়া ব্যাখ্যা) দিলেই পাবেন। সচিব ব্যাখ্যা চেয়েছেন। দেখি কী ব্যাখ্যা দেয়।'
এর মধ্যেই গতকাল শোকজের জবাব দিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। মন্ত্রণালয় এখন তার ব্যাখ্যা যাচাই-বাছাই করে দেখছে।



আরও পড়ুন

×