ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

কওমি ধারার সাত দলকে নিয়ে নতুন জোটের উদ্যোগ হেফাজতের

কওমি ধারার সাত দলকে নিয়ে নতুন জোটের উদ্যোগ হেফাজতের
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০২:৪৯

কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সাতটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এর মধ্যে তিনটি দল জামায়াতে ইসলামীর জোটে এবং একটি বিএনপির সঙ্গে রয়েছে। 

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে মতবিনিময় এসব আলোচনা হয়েছে। তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলগুলোকে বলা হয়েছে, নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনার পর ঐক্যের রূপরেখা দিতে। আগস্টের বৈঠকে তা উত্থাপন করা হবে।
 
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও ছিল। বিএনপির জোটে থাকা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও ছিল। ছিল জামায়াতের জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত মজলিস। জামায়াতের জোট থেকে সম্প্রতি বেরিয়ে যাওয়া খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী ঐক্যজোট প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
 
চরমোনাইয়ের পীরের ইসলামী আন্দোলন বাদে বাকি ছয়টি দল আগে থেকেই হেফাজতের সঙ্গে যুক্ত। এই দলগুলোর নেতারা হেফাজতের পদধারী নেতা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করেন অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের নেতারা। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা জামায়াতকে ঝোট দেওয়া হারাম বলেও ফতোয়া জারি করেন। তবে এতে জোট ছাড়েনি জামায়াতের সঙ্গে থাকা দেওবন্দি উসুলে পরিচালিত দলগুলো।

বৃহস্পতিবারের বৈঠক সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, হেফাজত আমির উদ্যোগ নিলেও জোট গঠনে সময় লাগবে। আপাতত লক্ষ্য নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়ি বন্ধ করা। তবে সভা শেষে হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, ৭টি দল ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। অল্প দিনের মধ্যেই সেই ঐক্যের প্রক্রিয়া নির্ধারিত হবে।

মাদ্রাসা নিয়ে বিরোধ থেকে ঐক্যের উদ্যোগ
হেফাজত এবং দলগুলোর নেতারা সমকালকে বলেছেন, কওমি ঘরনা দলগুলো নানা জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ায় মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ মাদ্রাসা নিয়ে জমিয়তের দুই পক্ষের বিরোধ তৈরি হয়। এতে জড়িয়ে যায় জামায়াতও।
 
একাধিক নেতা বলেছেন, জমিয়ত বিএনপির সঙ্গে থাকায় এবং কয়েকটি দল জামায়াতের সঙ্গে আলেম ওলামাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বাহাস হচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন আসন সমঝোতা নিয়ে জটিরলতায় জামায়াত ছাড়ার পর, তাদের সঙ্গে বিরোধ হচ্ছে অন্যদের। ঐক্যের জন্য চলতি মাসের শুরুতে রাবেয়াতুল ওয়াজিনের ব্যানারে রাজধানীতে সম্মেলন হলেও, মঞ্চেই বিরোধ তৈরি হয় বিএনপি ও জামায়াত প্রশ্নে।
 
দেওবন্দের অনুসারী কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই ৭ দল জামায়াতের অনুসরণ করা মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী তার ‘রাজতন্ত্র এবং খিলাফত’ বইয়ে হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) কঠোর সমালোচনা করেন। দেওবন্দ ধারার দলগুলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সাহাবিদের সত্যের মাপকাঠী তথা সমালোচনার ঊর্ধ্বে বলে মনে করেন। তাই প্রায় আট দশক ধরে জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামী দলের বিরোধ চলছে।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা দলগুলো সতর্ক করে বলেন, জামায়াতের আকিদা ঢুকে যাচ্ছে মাদ্রাসায়। এরপর নিয়ন্ত্রণও চলে যাবে। তাই আকিদা ও মাদ্রাসা রক্ষায় কওমি ধারার দলগুলোকে এক সঙ্গে থাকতে হবে। 

জোট ছাড়ার তাগিদ
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে খেলাফত মজলিসের দুই অংশ, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন জোট করে জামায়াতের সঙ্গে। প্রথম তিনটি দলকে জামায়াত আসন ছাড়লেও খেলাফতকে ছাড়েনি। এককভাবে ভোট করা এই দলটি নির্বাচনের পর জোট ছেড়েছে।  দলটিকে জামায়াত উচ্চকক্ষে আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। উচ্চকক্ষ অনিশ্চিত হওয়ায়, তারা একাই পথ চলতে চায়। 

বাংলাদেশ খেলাফত দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়ী হয়েছে। কোনো আসনে জিততে পারেন নেজামে ইসলাম। খেলাফত মজলিস সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট না ছাড়লেও, তারা ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে যাবে না। ফলে দলটি আর নেই জামায়াতের সঙ্গে।

বিএনপির সঙ্গে জোট করে জমিয়ত চারটি আসনে নির্বাচন করে। দলের আরেক অংশটিকে একটি আসন দেয় বিএনপি। তবে কোথাও জিততে পারেনি জমিয়ত। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার জমিয়তকে গুরুত্ব দিচ্ছে না- এ অভিযোগ তুলে দলটির নেতারা বারবার ক্ষোভ জানাচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, তারা নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে না থাকলে ইসলামপন্থিদের ভোটে জামায়াত জিতত। এই ভোট বিএনপির দিকে এনেছিল জমিয়ত। কিন্তু এর মূল্যায় হচ্ছে না। 

আসন ভাগাভাগির বিরোধের পর জামায়াত জোট ছেড়ে এককভাবে  ২৫৪ আসনে নির্বাচন করে ইসলামী আন্দোলন। শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষের বছরগুলোতে আওয়ামী লীগের পক্ষ নেওয়া ইসলামী ঐক্যজোটও এককভাবে নির্বাচন করে। 

কওমি ধারার দলগুলো বহুভাগে ভাগ হয়ে পড়া এবং বিরোধের কারণে  হেফাজত উদ্যোগ নিয়েছে, তাদেরকে এক করার। বৈঠকে যোগ দেওয়া বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন সমকালকে বলেছেন, নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমাতে হেফাজত আমির আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছেন। কওমি ঘরনার দলগুলোর নিজস্ব ঐক্য রয়েছে। রাজনৈতিক জোট হবে কিনা, তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। 

বৈঠক সূত্র জানায়, জমিয়ত নেতারা প্রস্তাব করেন ইসলামপন্থি দলগুলোকে জামায়াত ছাড়তে হবে। তখন অন্যরা বলেন, তাহলে জমিয়তকে বিএনপি ছাড়তে হবে। জমিয়ত নেতারা বলেন, অন্যরা জামায়াত ছাড়লে তারা বিএনপি ছাড়তে প্রস্তুত। 

জমিয়তের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী সমকালকে বলেছেন,  সাতটি দল ঐক্যবদ্ধ থাকতে একমত হয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় তা হবে, এ নিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। সবাই তা হেফাজত আমিরকে দেবে। 

আরও পড়ুন

×