ঢাবিতে শিল্প প্রদর্শনী
‘পরবর্তী প্রজন্ম থেকে সংস্কৃতি চর্চা যেন হারিয়ে না যায়’
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২১:০৭
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিল্পাচার্য জয়নুল গ্যালারিতে চলছে পাঁচ দিনব্যাপী শিল্প প্রদর্শনী। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ৫০তম ব্যাচের (১৯৯৭-৯৮ সেশন) আয়োজনে শুক্রবার বিকেলে জয়নুল গ্যালারি-১-এ এই প্রদর্শনী শুরু হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী অধ্যাপক ফরিদা জামান।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চিত্রশিল্পী ও কবি জাহিদ মুস্তাফা।
‘এ গ্রুপ আর্ট এক্সিবিশন’ শিরোনামে এই প্রদর্শনীতে ২৩ জন শিল্পীর ৪৬টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য থেকে শুরু করে গাজার জন্য মানবিক আবেদনের প্রতিফলন। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীদের পরিবারের অনেক সদস্যের শিল্পকর্মও।
প্রদর্শনীতে উল্লেখযোগ্য কিছু কাজের মধ্যে রয়েছে ব্লাড অ্যান্ড ব্লসমস (১,২), হুইস্পার অব টাইড, হুইস্পার অব সাইলেন্স, মায়া, বাংলার বধু, প্রকৃতি, বৃক্ষ কথন, দুর্গার বিয়ে, দ্য লাস্ট রিডার অব পোয়েট্রি, দ্য গার্ডেনার, অপেক্ষা, সৃষ্টির ছন্দ এবং রেডিয়েন্স ইন দ্য ডার্ক।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন- নাজমুন আক্তার, মুহাম্মদ আলী সাগর, মুহাম্মদ মেহেদী হাসান, দেওয়ান আতিকুর রহমান, ড. মোহাম্মদ ফেরদৌস খান শাওন, সাব্বির আহমেদ, তাহমিনা হাফিজ লিসা, শামীম আকন্দ, সুশান্ত কুমার সাহা অনুপম, মারুফা আহমেদ, মো. মশিউর রহমান মোর্শেদ, নাজিয়া মাসুদ খান, উত্তম কর্মকার, শেখ আনোয়ার আমজাদ হোসেন মানিক, শাহিদা হোসেন শিউলী, শারমিন ফাতেমা, কানিজ সালমা আঁখি, ফাতিমা-তুজ-জোহরা মালা, নুরুন নাহার রোজী, শামীম আক্তার, পলি রানী কর্মকার, অরা ওফেলিয়া, রেশ রহমান, রামিন দেওয়ান, মুনতাজার আকন্দ সায়হান, শেখ ওয়াফি নাশি।
প্রদর্শনী নিয়ে শিল্পী ফরিদা জামান বলেন, ‘অ্যাকাডেমিক শিক্ষার এত বছর পর তোমরা বন্ধুরা আবার একত্রিত হতে পেরেছ। নিজেদের কাজ নিয়ে, পরিবারের অনেককে সঙ্গে নিয়ে প্রদর্শনী করতে পারছ, এটাই শিল্পের শক্তি। একজন শিল্পী শুধু কাজ নিয়েই নয়, তার চিন্তা চেতনা দ্বারা শিল্পী হয়ে উঠে। তোমাদের চিন্তা, জীবনাচরণে সেই সত্য ছিল বলেই হয়তো এটা সম্ভব হচ্ছে। তোমাদের জন্যে অনেক শুভ কামনা রইল।’
শিল্পতাত্ত্বিক জাহিদ মুস্তাফা বলেন, ‘৫০তম ব্যাচের এই প্রদর্শনীর আমি সাফল্য কামনা করছি। এখানে কিছু কাজ একাডেমিক পর্যায়ের হলেও কিছু কাজ বিষয় নির্বাচন, শৈলী ও বিন্যাসে শিল্পীর নিজস্বতার পরিচয় হয়ে উঠেছে। কোন গ্রুপ এক্সিবিশনের সৌন্দর্যই এটা। এখানে অনেক ধরনের কাজের সন্নিবেশ ঘটে। দর্শকের একটা গ্যালারিতে অনেক ধরনের কাজ দেখার অভিজ্ঞতা ঘটে।’
প্রাক্তন শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আলী সাগর বলেন, ‘প্রায় ২৭ বছর আগে অক্টোবর মাসেই আমাদের ক্লাশ শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধরণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা চারুকলায় পড়তে আসি। একেক জনের কথা বলার ভঙ্গি আলাদা, চিন্তা করার ভঙ্গি আলাদা, জগৎ সম্পর্কে ধারণা আলাদা। কিন্তু পার্থক্য যতই থাকুক, দুটো ব্যাপারে আমাদের খুব মিল। এক- সবারই বয়স প্রায় এক! দুই- আমরা ছবি ভালোবাসি। ডিজাইন, ফর্ম, আকার আকৃতি এইসব আমাদের টানে। তার জন্যই তো পড়তে আসা এখানে। আমাদের ভাব ভালো লাগে, সুর ও সৌন্দর্য ভালো লাগে, ঘাসের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে ভালো লাগে। এক বয়েসের সূঁতোয়, সৃষ্টি ও সৌন্দর্যের রূদ্রাক্ষ দিয়ে- গাঁথা আমরা সবাই।’
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত ব্যান্ডদল ‘শিরোনামহীন’ এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সদস্য, বেজিস্ট, লিরিসিস্ট জিয়াউর রহমান জিয়া। তিনি বলেন,‘আমার কাছে এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং দিক হচ্ছে একটা ব্যাচের এতজন বন্ধু মিলে এতগুলো বছর পর একটা এক্সিবিশন করছেন, যেখানে তারা তাদের সেকেন্ড জেনারেশনকেও প্রদর্শনীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের থেকে সংস্কৃতি চর্চাটা যেন হারিয়ে না যায়, সেই মেসেজটা খুব পরিষ্কার করে দিচ্ছেন তারা।’
প্রদর্শনীটির অন্যতম উদ্যোক্তা শিল্পী মারুফা আহমেদ জলি বলেন, ‘আমরা এখন অনেক দূরে দূরে সরে গেছি। জীবন বিভিন্ন পথে নিয়ে গেছে আমাদের। কিন্তু সেই ছবি বা শিল্পের প্রতি অনুরাগ থেকে দূরে নিতে পারে নি। আমরা শিল্পের সাথে আছি। দুই যুগেরও বেশি সময়- অনেকটা সময়। আমাদের যার যার দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক ভাবনা, সৌন্দর্যবোধ সবই এখন হয়ত আরও আলাদা। হয়ত আমরা একেকজন, সম্পূর্ণ আলাদা একেকজন মানুষ। শিল্পচর্চার মাধ্যম, স্টাইল, বিষয়বস্তু সবই যার যার মতো। কিন্তু সেই প্রথম বছরের শরতের জাদু-মন্ত্রে আজও আমরা এক। এই প্রদর্শনীর আনন্দটাও তাই।’
৫০তম ব্যাচের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে শিল্পী মেহেদী হাসান বলেন, ‘প্রদর্শনী থেকে কি পাওয়া যাবে – তা নিতান্তুই আপনাদের, মানে দর্শকের ব্যাপার। জগতের আর সব বস্তুর মতো আর্টও বড়োজোর একটা এক্সপেরিয়েন্সই দিতে পারে। সেই এক্সপেরিয়েন্স কার কেমন হবে, সেটা বলা মুশকিল। আমাদের বন্ধুদের কারো কোনো কাজ যদি আপনাকে দোলা দেয়, ভাবায়, একটু দাঁড়িয়ে দেখতে ইচ্ছা হয়, মনটা ভরে ওঠে- তবেই আমরা সার্থক।’
প্রদর্শনীটি আগামী ৭ অক্টোবর পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
- বিষয় :
- ঢাবি
- শিল্প প্রদর্শনী
- সংস্কৃতিচর্চা
