জাতীয় সংলাপে মাহফুজ আলম
সবাই সংঘাতের জন্য মুখিয়ে আছে
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা করতে হবে
রাজধানীর তোপখানা রোডের বিএমএ ভবনের ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে গতকাল শনিবার ‘মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’। সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:২৩ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, ‘সবাই সংঘাতের জন্য মুখিয়ে আছে এবং আপনারা অবশ্যই এটা অল্প কয়েক মাসের মধ্যে দেখতে পাবেন। আমি আশঙ্কা করছি, যদি এর সঙ্গে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ যুক্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
গতকাল শনিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের বিএমএ ভবনের ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে ‘মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ এ আয়োজন করে।
মাহফুজ আলম বলেছেন, মাজারসহ যত মতাদর্শের মানুষের বসবাস বাংলাদেশে রয়েছে, সবার মধ্যে যদি সংলাপের সুযোগ না থাকে, তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ চলে গেলেও সামাজিক ফ্যাসিবাদ রয়ে গেছে। আমাদের এখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা করতে হবে।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যারা ইসলামের নামে রাজনীতির চর্চা করেন, তারা গত হাজার বছর ধরে যে ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে, তাতে ভ্রুক্ষেপ করেননি। এ কারণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক দলের সংশ্লেষও জড়িত। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আলোচনার জায়গায় ধর্মকে বাদ দেওয়ার যে প্রকল্প, তাকে মোকাবিলা না করলে এই সংকট শিগগির কাটবে না। গত এক বছর মাজার, দরবারের ওপর যে হামলা হয়েছে, তারা যদি পাল্টা আঘাত করে, তাহলে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নস্যাৎ করবে।
মাহফুজ বলেন, আওয়ামী লীগ ‘দরবারগুলোর’ সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছে বলে তিনি শুনতে পেয়েছেন। দরবারগুলোকে এটা বোঝানোর জন্য যে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার এসে মাজার ভেঙে দিচ্ছে, মসজিদ থেকে বের করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই প্রশ্ন অন্তর্বর্তী সরকারের ইস্যু নয়। এটা ৫০ বছর ধরে চলছে। যখন সরকার পরিবর্তন হয়, মসজিদ কমিটি বদল হয়। ইসলামী ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদ বদল হয়।
মাকামের অন্যতম পরিচালক ইমরান হুসাইন তুষার এবং মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আয়াতুল ইসলাম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আইনজীবী ও সাংবাদিক মানজুর আল মতিন, দ্য ডিসেন্ট সম্পাদক ও ফ্যাক্টচেকার কদরুদ্দীন শিশির, কবি ও সমালোচক ইমরুল হাসান, লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ ও তাহমিদাল জামি, গবেষক ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বাহাছ পত্রিকার সম্পাদক জোবাইরুল আরিফ, লেখক ইফতেখার জামিল ও ওমর ফারুক ফেরদৌস, সাংবাদিক ইয়াসির আরাফাত, কবি ও লেখক রাফসান গালিব, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গলের রিসার্চ লিড আহমেদ দীন রুমি, কবি ও লেখক সৈয়দুল হক, সমাজসেবী ও সংগঠক মুহাম্মদ মাঈন উদ্দীন, কানজুল হিকমা রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক সুলতান মাহমুদ সোহেল প্রমুখ। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সারাদেশের বিভিন্ন মাজারের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে ড. আয়াতুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ অলি-আউলিয়ার দেশ। এখানে সব ধর্ম-মতের মানুষের পাশাপাশি বসবাস। আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি হজরত শাহজালাল, শাহ পরাণ ও অন্যান্য আউলিয়াদের মাজার-দরবারে মানুষ জিয়ারত করতে যান। এই সংস্কৃতি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, সব ধর্ম-মতের মানুষ সহিংসতাকে মোকাবিলা করে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করবেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, মাজারে সহিংসতা বিষয়ে কথা বলা একটা ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে। এই ট্যাবু ভাঙতে হবে। আমাদের দেশে মাজার, দরবারের দায়িত্বশীল যারা আছেন, তাদের একটা ঘাটতি হলো, তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখতে পারছেন না। যে কারণে তাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারছে না। সুফি সমাজের এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে আপনারা অবদান রাখতে পারবেন। মাজার-দরবারে যে সহিংসতা হলো, এগুলোর তদন্ত ও অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রের একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা দরকার।
মানজুর আল মতিন বলেন, কোরআন এত সুন্দর, নির্মল ও পবিত্র। অথচ কোরআনের নাম ধারণ করে অনেকে মাজার-দরবারে হামলা চালাচ্ছেন। এটা একজন মুসলমান হিসেবে সহ্য করা কষ্টকর। এই সহিংসতার ফলে দেশের সমাজ ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এই বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট আরও ঘনীভূত হবে, যা কারও জন্য কল্যাণকর নয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাকামের মিজানুর রহমান। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, মাজার বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির একটি অংশ। বাংলাদেশের জনগণ, সমাজ ও সংস্কৃতির একটি অনুষঙ্গ। এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গটি ধারাবাহিক ও সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণের শিকার হয়ে বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। কেবল সুফি সমাজ নয়, বরং বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ ও তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর এ আঘাত কেউ মেনে নিতে পারছেন না। আয়োজকদের পক্ষ থেকে গত এক বছরে সারাদেশে মাজারে সহিংসতা নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়।
- বিষয় :
- জাতীয় সংলাপের ডাক
