ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়ছে স্বাভাবিক প্রসব

উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়ছে স্বাভাবিক প্রসব
×

তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৯:২১ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:১৫

দুই বছর আগেও অবহেলায় পড়ে ছিল পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বকুলবাড়িয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। ওষুধ ছিল না, চিকিৎসক ছিল না, ফলে রোগীও আসত না। প্রসূতিদের যেতে হতো শহরে, অনেক সময় সিজার করাতে হতো, খরচও পড়ত বেশি। ঝুঁকিতে থাকতেন মা ও নবজাতক। এখন এ চিত্র পাল্টে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই কেন্দ্রেই গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৫টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে; যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। রোগীর সংখ্যাও তিন গুণ।

ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গর্ভকালীন, প্রসবকালীন, প্রসবোত্তর, নবজাতক ও যৌনবাহিত রোগের সেবা দেওয়া হয়। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, স্যালাইন, ট্যাবলেট, ইনজেকশন, বাটারফ্লাই সুচ, একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ, জীবাণুমুক্ত সার্জিক্যাল গ্লাভস, তুলা, গজ, সার্জিক্যাল টেপ, স্যানিটারি ন্যাপকিনসহ ২২ ধরনের ওষুধ ও সামগ্রী এখান থেকে দেওয়া হয়।

ইউনিয়নের বকুলবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ লামিয়া বেগম (২৬) বলেন, ‘আমাগো মতো গরিব মাইনষের অনেক উপকার হইছে। আগে বাড়িতেই ডেলিভারি হইত, ভয় পাইতাম। শহরে গেলে সিজারে টাকা লাগত। এখন বিনা পয়সায় সেবা পাই।’

এই কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ সহকারী খাদিজা আক্তার বলেন, আগে মানুষ খুব একটা আসত না। জনবল কম ছিল, ওষুধও থাকত না। এখন নিয়মিত সেবা দেওয়া যায়। রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, স্বাভাবিক প্রসবও অনেক বেশি হচ্ছে।

একই দৃশ্য দেখা গেছে বরগুনার তালতলী উপজেলার বেহালা কমিউনিটি ক্লিনিকে। এক বছর আগেও এখানে ওষুধ বা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ছিল না। সারাদিনে রোগী মেলানো যেত না। এখন প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন মা ও শিশু সেবা নিচ্ছেন এই ক্লিনিক থেকে, মিলছে ২২ ধরনের ওষুধ। আগামী মাস থেকে চালু হবে ডায়াবেটিস পরীক্ষার ব্যবস্থা।

গত ১৬ অক্টোবর ওই ক্লিনিকে সেবা নিতে এসেছিলেন বেহালা গ্রামের চার সন্তানের মা রাজিয়া বেগম (২৮)। তিনি বলেন, ‘আগে তো আমরা ক্লিনিকে আসিনি। আত্মীয়ের মুখে শুনে এসেছি। দরকারি সব ওষুধ এখানেই পাই। এখন নিয়মিত আসি।’

গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর পটুয়াখালী ও বরগুনার কয়েকটি ইউনিয়নের চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, এসব কেন্দ্র এখন আগের চেয়ে অনেক পরিচ্ছন্ন ও সরঞ্জামসমৃদ্ধ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের ভিড়ে ক্লিনিকগুলো সরগরম।

এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক মানবিক সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড। স্থানীয় সংগঠন নজরুল স্মৃতি সংসদ (এনএসএস) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ভলান্টারি অ্যাকশনস ফর সোসাইটির (আভাস) সহায়তায় সংস্থাটি বাস্তবায়ন করছে ‘উপকূলীয় অঞ্চলে নারী, নবজাতক, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক প্রকল্প।

প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা কার্যক্রম ও অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক প্রসব বেড়েছে, সেবার মানও উন্নত। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি চলছে বরগুনার আমতলী, তালতলী ও পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায়। প্রকল্পটি চলবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, প্রয়োজনে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক প্রসবসহ এক লাখ ৬৬ হাজার ৩১ জন নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন সেবা নিয়েছেন। রোগীর সংখ্যা এখন দৈনিক তিন গুণ হয়ে ২০ জন থেকে ৫০ জনে দাঁড়িয়েছে।

সরকারও মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজননসেবা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের জন্য নতুন উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য গঠিত হয়েছে স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট। এর মাধ্যমে সারাদেশে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী ও শিশুর চিকিৎসাসেবা আরও বিস্তৃত হবে।

কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রোগ্রাম পরিচালক ডা. শেখ শাহেদ রহমান সমকালকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। মা ও শিশুর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, ডায়রিয়া ও ত্বকের রোগ এখন অনেক বেশি দেখা যায়। তাই স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। এ জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং জনগণের সক্রিয় সম্পৃক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, ওষুধের সরবরাহ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি।

১১ মাস পর ফিরেছে কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা

তৃণমূলে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দিতে সারাদেশে ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে এসব ক্লিনিক প্রতিদিন গড়ে পাঁচ লাখ মানুষকে সেবা দিচ্ছে।

তবে অর্থ সংকটে ১১ মাস বন্ধ ছিল ওষুধ সরবরাহ ও সেবা কার্যক্রম। সাধারণত তিন মাস পরপর ওষুধ সরবরাহ করা হতো, কিন্তু চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) শেষ হওয়ার পর বরাদ্দ না থাকায় এই সংকট দেখা দেয়।

এই কর্মসূচির আওতায় মাতৃ, শিশু, প্রজনন ও কৈশোর স্বাস্থ্য (এমসিআরএএইচ) নামে একটি অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে ক্লিনিকগুলো চালানো হতো। এর মেয়াদ শেষ হয় ২০২২ সালের জুনে। এরপর ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হলেও কোনো নতুন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। পরে প্রস্তাবিত পঞ্চম এইচপিএনএসপি (২০২৫ থেকে ২০২৯) নেওয়ার উদ্যোগ হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত বছর জুলাইয়ে ওপি স্থগিত করে দেয়। ১১ মাস পর নতুন করে কার্যক্রম শুরু হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী। এখন সরকারিভাবে বেতন ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এতে সংকট কেটে গেছে। সেবার মান বাড়াতে এখন ক্লিনিকগুলোর পরিচালনায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) যুক্ত হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট থেকে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজননসেবায় অর্থ ব্যয় করা হবে। আগে দায়িত্বে ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।

কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের বাজেটের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ চিকিৎসাসেবায় ব্যয় করার বিধান আছে। আগে এক টাকাও খরচ করা হয়নি। এবার ডিসি ও ইউএনওদের যুক্ত করা হয়েছে, তারা ইতোমধ্যে অর্থদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। 

তিনি আরও বলেন, ট্রাস্টের মাধ্যমে ১২০ কোটি টাকার ওষুধ কেনা হয়েছে এবং সব জেলায় পাঠানো হয়েছে। নতুন করে ৪৫ কোটি টাকায় ওষুধ কেনার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। এখন আর কোনো সংকট নেই।

ডিপিপির অপেক্ষায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র

দেশজুড়ে চার হাজার ৫৭৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পের মেয়াদ প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদ বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্যই সরকারি বরাদ্দে পরিচালিত হবে। এ জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে আগের চেয়েও বড় পরিসরে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

×