এমআরডিআইর আয়োজনে পরামর্শ সভা
সংবাদমাধ্যমে টেকসই স্ব–নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ২৩:৩২
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, জবাবদিহি জোরদার, জনআস্থা ফেরানো এবং মানসম্মত সাংবাদিকতা ধরে রাখতে টেকসই স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোগী হতে হবে। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা: আইনি কাঠামো, বৈশ্বিক অনুশীলন ও জবাবদিহির পথনির্দেশনা’ বিষয়ক তিনটি পরামর্শ সভায় এমন সুপারিশ এসেছে। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক থেকে শুরু করে বার্তাকক্ষের ব্যবস্থাপক, সংবাদকর্মী, ইউনিয়ন ও অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যম উন্নয়নকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। গত ৮ এবং ১৫ নভেম্বর ঢাকায় এসব পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এমআরডিআইর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এসব সভায় অংশীজনরা বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। যার মধ্যে রয়েছে পক্ষপাতমূলক রিপোর্টিং, ভিন্নমতের দমন, মালিকানা কেন্দ্রীকরণ, শাস্তিমূলক আইন, পেশাগত নীতিমালার দুর্বল প্রয়োগ, সংবাদভোক্তার অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার অভাব এবং সাংবাদিকদের জন্য অপর্যাপ্ত সুরক্ষা। তারা জানান, সাংবাদিকতা আজ অস্তিত্বের সংকটের সম্মুখীন এবং এখনই একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেন।
অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; টেকসই সংস্কারের জন্য প্রয়োজন সকল অংশীজনের সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ, যেখানে নেতৃত্ব দিতে হবে সংবাদমাধ্যম শিল্পকেই। শুধু সুরক্ষা নয়-ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকার কৌশলও থাকা উচিত এই স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে। এজন্য তারা সংবাদমাধ্যমকে নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড প্রণয়ন এবং অনুসরণের আহ্বান জানান।
আলোচকরা মনে করেন, একটি কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করতে পারবে। একইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমকেও যেকোন ভুলের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে এবং অসত্য, অপতথ্যের যুগে জনগণের অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে জনস্বার্থ রক্ষা করবে। তারা বলেন, সংবাদভোক্তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে, পেশাদার তদারকি জোরদার করতে, জবাবদিহি বাড়াতে এবং জনগণের অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে একটি শক্তিশালী ও বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামো প্রয়োজন। তারা কেবল সাংবাদিকদের জন্য নয়, মালিক ও সম্পাদকদের জন্যও আচরণবিধির দাবি জানান। এই আচরণবিধি কেমন হবে তাও ঠিক করবে সংবাদমাধ্যম।
আলোচনায় তারা উল্লেখ করেন, টেকসই ব্যবসায়িক মডেল ও আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবে সংবাদমাধ্যম শিল্পে একটি অন্যায্য প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে অনৈতিক সাংবাদিকতার প্রতি উৎসাহী করছে।
সভায় বার্তাকক্ষের জ্যেষ্ঠরা কর্মক্ষেত্রে তাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। তারা বলেন, অনেক বছর ধরে সরকার, গণমাধ্যম এবং জনগণের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি এবং ‘পারস্পরিক অনাস্থার’ সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। তারা সংবাদমাধ্যমগুলোর অভ্যন্তরে আরও শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থারও দাবি জানান। এক্ষেত্রে তারা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন প্রস্তাবিত জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠাকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বলেও উল্লেখ করেন। সভায় পূর্ববর্তী সরকারের মালিকানা কাঠামো ও লাইসেন্সিং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয় এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মানসম্মত অডিট, বাধ্যতামূলক তথ্য প্রচার এবং সংবাদমাধ্যম ও দর্শক-পাঠকের মধ্যে নিয়মিত উন্মুক্ত আলোচনার দাবি ওঠে।
সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল, সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিযোগ গ্রহণ, মান বজায় রাখা এবং সংবাদভোক্তাদের প্রতি জবাবদিহির জন্য একটি কাঠামোগত ব্যবস্থা নিশ্চিতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে স্বাধীন ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে যা পাবলিক এডিটর, রিডার্স এডিটর বা এনগেজমেন্ট এডিটর হিসেবে কাজ করতে পারে। অংশগ্রহণকারীরা ন্যায়পালের ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং সামগ্রিক ম্যান্ডেট নির্ধারণে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।
অংশগ্রহণকারীরা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কার এবং নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তাসংক্রান্ত দৃঢ় অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পর এসব অঙ্গীকার যেন ভুলে না যায় সে অনুরোধও জানান।
তারা বলেন, সরকারের পদক্ষেপ, এমনকি, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নও এককভাবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। পরিবর্তন আসতে হবে গণমাধ্যম শিল্পের ভেতর থেকেই। কিছু সংবাদমাধ্যম সফলভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে অন্যরাও উৎসাহিত হবে। পাশাপাশি, অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে তারা স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় বিশ্লেষণ, টেকসই অর্থায়ন মডেল ও আইনি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
এমআরডিআই পরামর্শ সভার সুপারিশগুলোকে একটি পলিসি ব্রিফ হিসেবে সংকলন করবে, যা সংবাদমাধ্যমের জন্য বাস্তবসম্মত, বিশ্বাসযোগ্য ও সমষ্টিগত স্ব-নিয়ন্ত্রণ মডেল উন্নয়নে সহায়তা করবে। পলিসি ব্রিফটি সম্পাদকীয় সংস্থা ও মালিকদের সংগঠনগুলোর কাছে হস্তান্তর এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছে।
দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এবং যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের সহায়তায় ‘প্রোমোটিং ইফেক্টিভ, রেসপন্সিভ, অ্যান্ড ইনক্লুসিভ গভর্ন্যান্স ইন বাংলাদেশ (পেরি)’ কর্মসূচির অধীনে এসব পরামর্শ সভা আয়োজিত হয়। এই আয়োজন বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কারের পক্ষে অ্যাডভোকেসি সংক্রান্ত এমআরডিআইর কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার (২০২৫-২০৩০) অংশ।
- বিষয় :
- সংবাদমাধ্যম
