মুক্তি চেয়ে বাউলদের মানববন্ধন
আবুল সরকারের গ্রেপ্তারে ক্ষোভ সরকারের তীব্র সমালোচনা
বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নিন্দা
পালাকার ও বয়াতি আবুল সরকারের নিঃশর্ত মুক্তি এবং বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন চিন্তক ও কবি ফরহাদ মজহার সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বয়াতি ও পালাকার আবুল সরকারের মুক্তি ও মানিকগঞ্জে তাঁর ভক্তদের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে সাধু-গুরু ভক্ত ও ওলি-আউলিয়া আশেকান পরিষদ। এ সময় বক্তারা মাজার ও বাউলদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।
গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশের ইতিহাসে কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক মাজারে হামলা-লুটপাট হয়েছে। যারা এসবের সঙ্গে যুক্ত, তাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় না এনে সরকার পরোক্ষভাবে মদদ দিয়েছে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সরকারপ্রধানের আমলে এ রকম অশান্তির দৃষ্টান্ত দেশে তৈরি হয়েছে। এ দায় সরকারকেই নিতে হবে।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে লেখক ফরহাদ মজহার বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা হরণ করা হয়েছে। আগে ফ্যাসিস্টের রাষ্ট্র ব্যবস্থা দেখেছি। ৫ আগস্টের পর জাতিবাদ দেখছি। প্রশাসনকে দিয়ে আবুল সরকারের নামে মামলা দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে বিশেষ পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।’ তিনি বলেন, ‘যারা মাজারে হামলা করে তারা মোসাদের চর, ইহুদিদের এজেন্ট। তারাই ইসলামকে বিতর্কিত করে ধ্বংস করতে চায়। আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা মানে আমাকে গ্রেপ্তার করা।’ মানিকগঞ্জে একটি বাউল সম্মেলন ও দেশের সব বাউলকে ঢাকায় এনে মহাসম্মেলনের ঘোষণা দেন তিনি।
বাউলদের ওপর হামলায় পুলিশ মামলা নেয়নি অভিযোগ করে আবুল সরকারের সহধর্মিণী পালাকার আলেয়া বেগম বলেন, ‘বাউল-ফকিরদের ওপর হামলার মামলা নিতে পুলিশ গড়িমসি করছে। আমরা তো দেশেরই সংস্কৃতি। তাহলে আমাদের স্থান কোথায়?’ এ সময় তিনি আবুল সরকারের নিজের রচিত একটি ইসলামী গানও শোনান।
মানবাধিকারকর্মী মুনতাসির রহমান বলেন, ‘নিজ ধর্মবিশ্বাস পালন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান-সংরক্ষিত অধিকার। আবুল সরকারের গ্রেপ্তার এ অধিকারের লঙ্ঘন। ধর্ম অবমাননা– এমন অস্পষ্ট আইনে কাউকে গ্রেপ্তার করা অগ্রহণযোগ্য।’
বাউলদের ওপর হামলা ও পালাগানের অপব্যাখ্যার অভিযোগ দিয়ে ‘শরৎ উদযাপন কমিটি’র সদস্য দীপঙ্কর রায়হান বলেন, ‘বাউলদের ওপর হামলা ন্যক্কারজনক। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গানের খণ্ডাংশ ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।’
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বাউল গোলাপী, ইব্রাহিম মিয়া, শাহীন সরকার প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন কবি ও ভাববৈঠকীর প্রধান সমন্বয়ক মোহাম্মদ রোমেল। তিনি বলেন, ‘তৌহিদী জনতা ধর্মের নামে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলো ভোট হারানোর ভয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করছে না।’
মানববন্ধন শেষে ‘সাধু-গুরু ভক্ত ও ওলি-আউলিয়া আশেকান পরিষদে’র পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেয়। এতে বলা হয়, ‘প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একটি পালাগানের পরিবেশনার প্রেক্ষিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বয়াতি ও পালাকার আবুল সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে তাঁর ভক্তরা মানববন্ধন করতে গেলে তাদের ওপর দুর্বৃত্তরা বর্বরোচিত হামলা চালায়। আমরা এ হামলার তীব্র নিন্দা জানাই এবং অবিলম্বে আবুল সরকারের নিঃশর্ত মুক্তি চাই।’
পালাগানে তর্ক-বিতর্ক, যুক্তি-খণ্ডন এবং প্রতীকী চরিত্রাভিনয়ের মধ্য দিয়ে ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার বিস্তার ঘটে। আবুল সরকার সুফি ধারার শিল্পী। এ ধারায় নাস্তিকতার কোনো স্থান নেই। বরং আল্লাহ ও রাসূলের প্রশংসা ও প্রেমগাথাই তাদের প্রধান বিষয়বস্তু। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ স্পষ্টতই ভিত্তিহীন ও অসৎ উদ্দেশ্যমূলক।
বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নিন্দা
বাউল শিল্পীদের ওপর ‘তৌহিদী জনতা’র হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। সেই সঙ্গে আবুল সরকারকে মুক্তির দাবি জানান তারা। গতকাল তারা পৃথক বিবৃতিতে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিও জানান। পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ এক বিবৃতিতে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট শক্তির সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত। এক ফ্যাসিস্ট হটিয়ে দেশের মানুষ আরেক ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান দেখতে চায়নি।
সাম্প্রদায়িক মব সন্ত্রাসীদেরসহ বিভিন্ন জায়গায় মাজারে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান বজলুর রশীদ ফিরোজ।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার উগ্র ডানপন্থি শক্তিকে বিভিন্নভাবে মদদ জুগিয়ে দেশকে নতুন এক বিপদে ঠেলে দিচ্ছে। বাউল-ফকিরদের পাশে বিবেকবান দেশবাসীকে দ্ব্যর্থহীন ও সোচ্চারভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বিবৃতিতে বলেন, আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাহক বাউলদের নির্যাতনের এমন ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বিবৃতিতে বলা হয়, বাউল ঐতিহ্যসহ দেশের সব সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ধারা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। শিল্প-সংস্কৃতির ওপর হামলা বা বাধা দেওয়া আইন ও মানবাধিকারের পরিপন্থি।
- বিষয় :
- বাউল গানের অনুষ্ঠান
