ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সাইবার জগতে অনিরাপদ নারী হয়রানির শিকার পদে পদে

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস আজ

সাইবার জগতে অনিরাপদ নারী হয়রানির শিকার পদে পদে
×

হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫২ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহসভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছিলেন শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। নির্বাচনের আগে তাঁকে অনলাইনে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। নির্বাচনের পরও তা থামেনি। ইমি নির্বাচনে ৬৮ ভোট পান। এরপর তিনি ফেসবুকে কোনো পোস্ট বা কমেন্ট করলেই তাঁকে শাহবাগী, স্বৈরাচারের দোসর ট্যাগ দেওয়া হয়। ভোটের সংখ্যাকে কটাক্ষ করে অশোভন ইঙ্গিত করা হয়। এ ছাড়া ইনবক্সে গালি, অশ্লীল ছবি ও হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে ইমি তাঁর ফেসবুক পোস্টের কমেন্ট অপশন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।

শুধু ইমি নন, ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগরসহ প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদ নির্বাচনে যে প্যানেল থেকেই দাঁড়ান না কেন– প্রত্যেক নারী প্রার্থী অনলাইনে নানাভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জাকসু ও চাকসুতে নারী পদে প্রার্থী সংকট দেখা দেয়। ইমি বলেন, মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এ জন্য অনেক জায়গা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে শুধু বুলি নয়, নারীকে দমিয়ে রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিকৃত (ডিপফেক) ছবি বানিয়ে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগে গত ৩ নভেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া। এভাবে সাইবার বুলিং বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজে গভীর সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নারী হলেই নানা ধরনের প্রযুক্তিগত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার।

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায় ৫৯ শতাংশ নারী সাইবার আক্রমণের কবলে পড়ছেন। হয়রানি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, ভুক্তভোগী অনেক নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আজ ২৫ নভেম্বর পালিত হচ্ছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। এই দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘সাইবার সহিংসতাসহ নারী ও কন্যার প্রতি সকল প্রকার নির্যাতনকে না বলুন, নারী ও কন্যার অগ্রসরমানতা নিশ্চিত করুন’। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আজ বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া বেলা ১১টায় ‘নারী অধিকার সুরক্ষায় শক্তিশালী নিবন্ধন আইন’ শীর্ষক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হবে।

নারীকে দমাতে সাইবার বুলিং
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, সাইবার বুলিংয়ের শিকার মূলত নারীরা বেশি হন। যেসব নারী নিজস্ব বক্তব্য নিয়ে অনলাইনে সরব হন, তাদের দমাতে সাইবার বুলিং হচ্ছে, নানাভাবে সেই নারীকে নাজেহাল করা হচ্ছে। এই হয়রানি এতটা ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে যায়, অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। তারা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন, কথা বলতে বা জনপরিসরে সামনে আসতে চাইছেন না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় নারীদের নিয়ে করা এক গবেষণার (এতে তিনিও যুক্ত ছিলেন) বরাত দিয়ে বলেন, সাইবার হয়রানির কারণে আন্দোলনে সক্রিয় বেশির ভাগ নারী এখন জনমসমক্ষে আসতে ভয় পান। অনলাইনে আক্রমণের শিকার নারীকে পরিবার ও আশপাশের মানুষ নিরুৎসাহিত করেন। তরুণী, যারা রাজনীতিতে আসতে চাইছেন, তাদের জন্য এটি খুব বড় চ্যালেঞ্জ।

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাবি শাখার সভাপতি নূজিয়া হাসিন রাশা বলেন, ডাকসু নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের জন্য অনলাইন বিভীষিকা হয়ে দাঁড়ায়। ছবির পোস্টে কমেন্টে নোংরা ভাষায় তাদের আক্রমণ করা হতো। অশ্লীল ফটোকার্ড করে হয়রানি করা হয়। দলমত, হিজাবি, হিজাব ছাড়া সব ধরনের নারীকে এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নর্তকী/রাতের রানীসহ গালির মুখে তাদের পড়তে হয়েছে। কর্তৃপক্ষের কাছে এসব বিষয়ে অভিযোগ করলেও ব্যবস্থা নিত না। এসব আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীর রাজনৈতিক উত্থান বাধাগ্রস্ত করা।

লেখক ও নারী অধিকার কর্মী ফেরদৌস আর রুমী বলেন, সমাজ নারীদের সব সময় ঊনমানুষ হিসেবে দেখে। নারীদের কোনো এজেন্সিকে সমাজ স্বীকার করতে চায় না। নারীর পোশাক, চালচলন– সব কিছুতে সমাজ নিজস্ব মতামত চাপিয়ে দিতে চায়। অনলাইনে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। তিনি বলেন, যখন আক্রমণকারীরা নারীর ব্যক্তিগত পছন্দের (পোশাক বা জীবনযাপন) ওপর সাইবার আক্রমণ চালায়, তখন এটি অন্য নারীর প্রতি বার্তা দেয় যে, ‘নির্দিষ্ট সীমার বাইরে গেলেই শাস্তি নিশ্চিত।’ যদি একজন নারী ক্রমাগত সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড পূরণে ব্যস্ত থাকেন, তবে তিনি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের মতো সামাজিক কাজে কম মনোযোগ দেবেন। এটি পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় রাখার কাঠামোগত প্রক্রিয়া।

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, অনলাইনে আমরা যা দেখি, সেই সাইবার বুলিং কেবল ভার্চুয়াল জগতের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আসলে বাস্তব সমাজের বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনার এক স্পষ্ট প্রতিফলন। অনলাইনে যে আক্রমণ দেখা যায়, তা সাইবার ত্রুটি নয়; বরং এটি সমাজের মধ্যে গেঁথে থাকা বৈষম্যমূলক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা চায়, নারী সমাজ সবসময় অধঃস্তন হয়ে থাকুক। নারী যখন খেলাধুলা, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বা সমাজ-সংস্কৃতিবিষয়ক কোনো ক্ষেত্রে জীবন্ত বা সজীব ভূমিকা পালন করে, তখন এই ক্ষমতা তা সহ্য করতে পারে না।
মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) উপদেষ্টা সালমা আলী বলেন, সাইবার বুলিংয়ের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞানের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে যারা ভুক্তভোগী, তারা জানে না কীভাবে এ সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হবে।

পরিসংখ্যানে নারী হয়রানি
গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের জরিপ অনুযায়ী, ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী প্রযুক্তির সহায়তায় লৈঙ্গিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এগুলো ব্ল্যাকমেল, ছবি নিয়ে অপব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

পুলিশ সদরদপ্তর পরিচালিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট সেন্টার ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে ৯ হাজার ১১৭টি হয়রানির অভিযোগ আসে। এসব হয়রানির ভুক্তভোগী ৯০ শতাংশই নারী।

অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতায় পরিচিত-অপরিচিত, সাবেক স্বামী, সাবেক প্রেমিক, অনলাইন বন্ধু, সহপাঠী-বন্ধু, প্রতিবেশী কেউ পিছিয়ে নেই। ‘সাইবার সহিংসতার শিকার নারীদের মনো-সামাজিক পরিবর্তন এবং বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মূল্যায়ন’ শিরোনামের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পিএইচডি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯০ শতাংশ অনলাইন সহিংসতার ক্ষেত্রে কোনো নারী অভিযোগ করে না। অনলাইন বন্ধুর মাধ্যমে ২০ শতাংশ, অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ১৬ শতাংশ, সাবেক স্বামীর মাধ্যমে ১২ শতাংশ, বন্ধুর মাধ্যমে ৮ শতাংশ, সহকর্মী ও সহপাঠীর মাধ্যমে ৬ শতাংশ এবং স্বজনদের মাধ্যমে ৪ শতাংশ সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই শহরের বাসিন্দা।, প্রায় ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী, প্রায় ২৯ শতাংশ সরকারি ও ২০ শতাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১২ শতাংশ গৃহিণী। পুলিশের সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইন হেনস্তার প্রায় এক লাখ ৭৪ হাজার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪০টি মামলা হয়েছে।

সামিনা লুৎফা বলেন, অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। হেনস্তাকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

ফেরদৌস আরা রুমী বলেন, দেশে সাইবার অপরাধ দমনে অনেক ভালো ভালো আইন রয়েছে। কিন্তু এসবের প্রয়োগ না থাকায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে।

আনু মুহাম্মদ বলেন, এ সমস্যার সমাধান হলো নারীর সক্রিয়তা আরও বাড়ানো। তাদের আরও বেশি সরব হতে হবে।

আরও পড়ুন

×