প্লট দুর্নীতি মামলা
রাজউক ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়কে আদালতের নির্দেশনা
রাজউক ভবন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ২২:৩৭ | আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০০:২৪
শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের বিশেষ কোটায় প্লট বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। মন্ত্রণালয় যেন এখন থেকে কারও জন্য আর প্লট বরাদ্দের সুপারিশ না করে। এই বিশেষ বরাদ্দ প্রথা বাতিল করতে হবে। বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন শেখ হাসিনার প্লট বরাদ্দের দুর্নীতি মামলার রায়ে এ নির্দেশনা দেন।
মন্ত্রণালয়ের জন্য আদালতের নির্দেশনা হলো-
১. সরকারের বিশেষ সুপারিশ নীতিমালা বাতিল করতে হবে।
২.বিশেষ শ্রেণির বরাদ্দ সংক্রান্ত কোনো সুপারিশ চলমান থাকলে তা বাতিল এবং নতুন করে এই শ্রেণিতে কোনো বরাদ্দ দেওয়া যাবে না।
৩. মন্ত্রণালয়কে রাজউকের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৪. স্বাধীন নজরদারি ইউনিট গঠন করতে হবে।
৫. অনিয়মে জড়িত মন্ত্রণালয়সহ রাজউকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. জাতীয় সম্পত্তি ডাটাবেস, ভূমি রেকর্ড, সিটি করপোরেশন হোল্ডিং, সাব-রেজিস্ট্রি ও টিআইএন নম্বরের সঙ্গে রাজউকের ডিজিটাল সংযোগ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৭. আবেদনকারীর তালিকা, যোগ্যতার ভিত্তি, প্লট নম্বর ও সুবিধাভোগীর তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।
৮. ডিজিটাল লটারি, পয়েন্ট-ভিত্তিক স্কোরিং ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার বাধ্যতামূলক।
৯. দুর্নীতি উন্মোচনকারী কর্মীদের জন্য আইনি সুরক্ষা ও পুরস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়, মন্ত্রণালয় যেন কোনোভাবে প্লট বরাদ্দে কারও জন্য সুপারিশ না করে। বিশেষ ক্যাটেগরিতে বরাদ্দের সুপারিশ প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। রাজউকের ওপর মন্ত্রণালয়ের তদারকি পুনঃস্থাপন করতে হবে। বরাদ্দ প্রক্রিয়ার ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। হুইসেল-ব্লোয়ারদের (তথ্য দানকারীর) আইনি সুরক্ষা ও পুরস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
রাজউকের প্লট বরাদ্দ বিধিমালা-২০০৪-এর ১৩/এ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী কোনো ব্যক্তিকে প্লট বরাদ্দের সুপারিশ করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির রাজউক আওতাধীন এলাকায় কোনো প্লট থাকতে পারবে না।
২০১২ সালে প্লট বরাদ্দ বিধিমালায় কিছুটা সংশোধনী আনা হলেও এ ধারাটি রাখা হয়। এর মাধ্যমে রাজউকের প্লট বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি নয়ছয়ের অভিযোগ ওঠে। এ ধারায় যারা রাজউকের প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন, তাদের মধ্যে বিতর্কিত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এ ধারার আওতায় জামায়াত নেতা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী বনানীতে প্লট পেয়েছিলেন। এ ছাড়া জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদকেও উত্তরায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্লট দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অনুসারীরাও এ ধারায় প্লট পেয়েছেন। তবে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নিজামী-মুজাহিদের প্লটের বরাদ্দ বাতিল করে। কিন্তু ওই প্লটে তারা বাড়ি বানিয়ে একসময় বসবাসও করেছেন।
আওয়ামী লীগ আমলে একই ধারায় ঢালাওভাবে প্লট বরাদ্দের ঘটনা ঘটে। দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মালী-ঝাড়ুদার, গাড়িচালকদেরও প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে রাজউক দেড় হাজারের মতো এ ধারায় প্লট বরাদ্দের তথ্য পেয়েছে।
রাজউক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পছন্দমতো লোকদের প্লট বরাদ্দে রাজউককে সুপারিশ করেছেন। তখনই রাজউক তাদের প্লট বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল উপশহর প্রকল্পে বিদ্যমান প্লটের চেয়ে বেশি বরাদ্দের ঘটনাও ঘটেছে। আবার এ ধারাতেই শেখ হাসিনাসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরাও প্লট পেয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব প্লটের কার্যক্রমের ওপর অলিখিত স্থগিতাদেশ দেয় সরকার। সোয়া বছর হলো এসব প্লটের বকেয়া কিস্তির টাকা রাজউক জমা নিচ্ছে না। কাউকে রেজিস্ট্রিও করে দিচ্ছে না। আবার কেউ বেচতে চাইলে অনুমতি মিলছে না। এসব প্লটে ঘরবাড়ি তৈরিরও অনুমতি পাচ্ছেন না বরাদ্দপ্রাপ্তরা।
আওয়ামী লীগের আমলে ১৩/এ ধারায় অনুমোদন দেওয়া বরাদ্দ বাতিল করতে ইতোমধ্যে আদালতে আবেদন জানিয়েছে সরকার। কিন্তু এই ধারায় প্লট পেয়ে অনেকে অভ্যুত্থানের আগেই আরেকজনের কাছে বেচে দিয়েছেন। আবার অনেক প্লট রেজিস্ট্রিও হয়েছে। কিছু প্লটে রাজউক আগেই নকশার অনুমোদন দিয়েছে। অনেক প্লট খালি। ওই সব প্লট মালিক এ নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন। তারা মাঝে মাঝেই রাজউকে ধরনা দিচ্ছেন। রাজউক থেকে জাতীয় নির্বাচনের পর যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে রাজউকের আইনজীবী ইমাম হাসান সমকালকে বলেন, আইনের মাধ্যমে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার একক ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। এখন নিম্ন আদালত নির্দেশনা দেওয়ার পর উচ্চ আদালতে সেটা কী হবে– এটা গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারা বা বিশেষ বরাদ্দ থাকবে কিনা, তা আদালতের ওপর নির্ভর করবে। যেগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটা বাতিল করা জটিল হতে পারে। দেখা যাক উচ্চ আদালত কী রায় দেন।
