বিজয়ের মাস
পদ্মা- মেঘনার তীরে পাকিস্তানি বাহিনীর ‘ডানকার্ক দশা’
একাত্তরের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ চলে আসে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। ওই সময় দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও বইয়ে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজন।
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০২ | আপডেট: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আশপাশের কিছু শহরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর পাকিস্তানি সেনাদের একাংশ ঢাকায় পৌঁছে গেছে। কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী পদ্মা-মেঘনা নদীর তীর ধরে অগ্রসর হচ্ছে ঢাকার দিকে। এমন পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার ব্রিফিংয়ে ওঠে ‘ডানকার্ক’ প্রসঙ্গ। ব্রিফিংটি হয় ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর।
জেনারেল অরোরা বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের বড় অংশই মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়েছে। নদী দিয়ে পালানোর চেষ্টা করা সৈন্যবাহী নৌকাগুলোতে বিমানবাহিনী টানা হামলা করছে। বন্দর ও নদীঘাটগুলোতে এক ধরনের ‘ডানকার্ক পরিস্থিতি’ তৈরির আশঙ্কা বাড়ছে। যে কোনো সময় ডানকার্কের মতো ঘটনা ঘটে যেতে পারে (নিউইয়র্ক টাইমস, ১০ ডিসেম্বর)।
_1765262006.png)
ডানকার্ক বা ডানকের্ক হলো ফ্রান্সের একটি সমুদ্রবন্দর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালের ১০ মে ফ্রান্স ও আশপাশের এলাকায় আক্রমণ করে জার্মানি। ধীরে ধীরে তারা ব্রিটিশ এক্সপিডিশনারি ফোর্সসহ (বিইএফ) ফরাসি ও বেলজিয়ান সেনাদের পিছু হটতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত সবাইকে সমুদ্রতীর ও ডানকার্ক বন্দরের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের পদ্মা ও মেঘনা নদীর তীরে এমন দশা হওয়ার প্রসঙ্গেই ‘ডানকার্ক’-এর উদাহরণ দেন জেনারেল অরোরা।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনার তীর
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পরও ঢাকা ছিল পাকিস্তানি সেনাদের দখলে। অন্য জেলায় তাদের বড় ঘাঁটি দখলের পর মিত্র বাহিনী অগ্রসর হয় ঢাকার দিকে। এই অগ্রযাত্রার ৯ ডিসেম্বরের পরিস্থিতি নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা লিখে, মুক্তিসংগ্রামীরা এগোচ্ছেন সব দিক দিয়ে। আশুগঞ্জ দিয়ে ভৈরব বাজার হয়ে। আশুগঞ্জ এখন মুক্ত। কিন্তু সেখানে মেঘনার ওপরের বিরাট পুলটা পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়ে গেছে। আরেকটি বাহিনী এগোচ্ছে দাউদকান্দির দিক দিয়ে। উত্তর দিক থেকে মুক্তিকামীরা এগোচ্ছেন জামালপুর হয়ে। এই পথে বড় কোনো নদী নেই।
কুষ্টিয়া মুক্ত করে আরেক বাহিনী এগোয় গোয়ালন্দ ঘাটের দিকে। ঢাকা মুক্ত করার লড়াইয়ে একসঙ্গে সব বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমান) যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর অংশ হিসেবে ভারতীয় নৌবাহিনী এগোয় পদ্মা ও মেঘনা ধরে। সেদিন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম লোকসভার ভাষণে বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের বাংলাদেশ থেকে পালানোর সব পথ এখন বন্ধ।
_1765262188.png)
তবে পাকিস্তানিদের অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের সময় সড়কগুলো হয়ে উঠছিল নির্মমতার সাক্ষী। ৯ ডিসেম্বর এমন কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ তাঁর নোটখাতায় লিখেন, পাকিস্তানি সেনারা যতই পিছিয়ে যাচ্ছিল, ততই বাঙালিদের জবাই করে হত্যার প্রমাণ মিলছে। আবার মুক্তিবাহিনী ও অন্যান্য বাঙালিও পাকিস্তানি এবং তাদের বেসামরিক সহযোগীদের ওপর বদলা নিচ্ছে।
বিপর্যয়ের মুখে
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে লেখা হয়, ৯ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনী কুষ্টিয়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুটি বড় রকমের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। প্রায় ৩ ব্যাটালিয়ন পদাতিক সৈন্য নিশ্চিহ্ন ও ১৬টি সোভিয়েত ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়। অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তানের (এপিপি) বরাতে লেখা হয়, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহে পাকিস্তানি সেনাদের পাল্টা আক্রমণে ‘শত্রুপক্ষের’ বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধন হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-আশুগঞ্জ এলাকাতেও ভারতীয় বাহিনী গুরুতর বিপর্যয়ে পড়ে।
মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) বীরবিক্রমের বই ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’-এও পাকিস্তানের পাল্টা আক্রমণের বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ৯ ডিসেম্বর দুপুরে ভারতের ১০ বিহার রেজিমেন্ট আশুগঞ্জে পাকিস্তানিদের ওপর হামলা চালায়। ওই আক্রমণ পাকিস্তানিরা বেশ ভালোভাবে প্রতিহত করে। সংঘর্ষে ভারতীয় বাহিনীর বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। অনেক সৈন্য নিহত ও আহত হয়।
ঢাকায় যা হচ্ছিল
পরাজয়ের আগে পাকিস্তানিরা মরণকামড় দিতে পারে– এমন শঙ্কায় ঢাকার অনেক বাসিন্দাই ব্যাংক থেকে টাকা তোলার তোড়জোড় শুরু করেন। জাহানারা ইমাম তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ে লিখেছেন, চেনাজানা প্রায় সবাই ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে রাখছে। তাদের শঙ্কা– পাকিস্তানিরা চলে যাওয়ার আগে সব টাকা জ্বালিয়ে দিতে পারে, আবার প্লেনে করে নিয়েও যেতে পারে। কিন্তু টাকা ঘরে রাখাটাও খুব সহজ ছিল না। যে কোনো সময় পাকিস্তানি আর্মি বাসায় ঢুকে সার্চ করে নিয়ে যেতে পারে– এমন শঙ্কাও ছিল।
এর মধ্যেই কারওয়ান বাজারে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। দৈনিক পাকিস্তানের ১০ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে লেখা হয়, কারওয়ান বাজারে অসামরিক এলাকায় বোমা বর্ষণ করে ভারতীয় বাহিনী। এতে ৭৫ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিল রহমত-ই-আলম ইসলামিয়া মিশন এতিমখানার প্রায় ৫০ শিশু ও শিক্ষক।
দৈনিক পাকিস্তান লিখে, কারওয়ান বাজারে বোমা বর্ষণের পর ভারতীয় বিমানের বেপরোয়া বোমা ও গুলিবর্ষণের ফলে সাড়ে তিনশ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। আদমজী নগরের হাউজিং কলোনিতে বোমা বর্ষণের ফলে সবচেয়ে বেশি ২৭৫ জনের প্রাণহানি ঘটে।
শরণার্থীদের ফেরার প্রস্তুতি
বাংলাদেশের বেশ কিছু এলাকা শত্রুমুক্ত হওয়ায় ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের ফেরানোর প্রস্তুতি শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে ৯ ডিসেম্বর ভারত সরকার ও সামরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা।
যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকের বিষয় ছিল পশ্চিমবঙ্গের ৭৩ লাখ শরণার্থীকে দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা। ভারত শরণার্থীদের ফেরার জন্য পরিবহন ও মাঝপথে বিশ্রামসহ যাবতীয় ব্যবস্থার আশ্বাস দেয়। আর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশে ফসল এবার খুব ভালো হয়েছে। চালের প্রয়োজন হবে না। তবে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস লাগতে পারে। সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে গিয়ে দেশে ফেরা ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেবেন।
