ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিজয়ের মাস

চারটি দল নিষিদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের সিদ্ধান্ত

১১ ডিসেম্বর ১৯৭১

চারটি দল নিষিদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের সিদ্ধান্ত
×

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর যশোরের জনসভায় দেওয়া হয় দল নিষিদ্ধের ঘোষণা। ছবি: আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৭ | আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তরের ১১ ডিসেম্বরের ঘটনার বর্ণনার আগে এক দিন পেছনে ফেরা যাক। ১০ ডিসেম্বরের দিনটি ছিল শুক্রবার। ঢাকায় সেদিন প্রায় তিন ঘণ্টা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ভারতীয় বাহিনী। এর পরপরই ঢাকায় অবস্থানরত জাতিসংঘের সহকারী সচিবের কাছে একটি আবেদন পাঠান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা। 

আবেদনটি ছিল অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি আয়োজন, ক্ষমতা হস্তান্তর ও সেনা প্রত্যাহার-সংক্রান্ত। ঢাকায় তখন জাতিসংঘের সহকারী সচিব ছিলেন পল মার্ক হেনরি। আর গভর্নরের উপদেষ্টা ছিলেন রাও ফরমান আলী। সে সময়কার ইত্তেফাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হয়েছিল ৮ ডিসেম্বর। পাকিস্তান তখন এর কিছু শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। তবে পরদিনই তারা এটিকে স্বাগত জানায়। কিন্তু ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয় ১১ ডিসেম্বর। 

মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা: ৭১’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদে যখন ফরমান আলীর চিঠি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ চলছিল, সে সময় হঠাৎ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক প্রস্তাব নাকচ হওয়ার সংবাদ পৌঁছায়। মূলত, ফরমান আলীর প্রস্তাব ওয়াশিংটনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সরকার সেটি রদ করার পরামর্শসহ ইয়াহিয়াকে জানায়, পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য সপ্তম নৌবহর ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হয়েছে। ফলে ইয়াহিয়ার মত পরিবর্তন হয়।

নিউইয়র্কে পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। ছবি: টাইমস আর্কাইভ

নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ফরমান আলীর চিঠিটি ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকজন সদস্যের মাঝে বণ্টন করেছিল মহাসচিব উ থান্টের দপ্তর। নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার জন্য আগের দিনই নিউইয়র্কে পৌঁছেছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। কিন্তু হঠাৎ ইয়াহিয়ার মত বদলে যাওয়ায়, ১১ ডিসেম্বর ভুট্টো একেবারেই চুপ ছিলেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে তাঁর বৈঠকও বাতিল হয়। 

‘যুদ্ধে জড়াবে যুক্তরাষ্ট্র’
তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন একদিকে পাকিস্তানকে যুদ্ধবিরতি রদের পরামর্শ দেয়। অপরদিকে দিল্লিকে যুদ্ধবিরতি মানাতে চাপ দেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর। ওয়াশিংটন তখন কেন এমন অবস্থান নিয়েছিল সেটির একটি উত্তর পাওয়া যায় নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক বেঞ্জামিন ওয়েলেসের লেখায়। 

মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে সে সময় এক প্রতিবেদনে বেঞ্জামিন লেখেন, প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পাকিস্তানকে ‘রাজনৈতিক সমর্থন’ দিতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া। আরেকটি হলো মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে বঙ্গোপসাগরের দিকে মোতায়েন করা।

মার্কিন নৌজাহাজ বঙ্গোপসাগরের দিকে নিতে সময়ের প্রয়োজন ছিল। অপরদিকে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতীয় বাহিনীও ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই অগ্রসরতা থামানো ও জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছানোর মতো সময় অর্জনের উদ্দেশে মার্কিন প্রশাসন ভারতকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর কৌশল নেয়।

‘মূলধারা: ৭১’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারতকে রাজি করাতে ১০ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভকে বার্তা পাঠান নিক্সন। এতে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের শর্ত ছাড়াই, যে যেখানে আছে সেই ভিত্তিতে ‘নিশ্চল যুদ্ধবিরতি’ কার্যকরের ব্যাপারে ভারতকে রাজি করাতে ব্রেজনেভের ওপর চাপের মাত্রা বাড়ানো হয়। নিক্সনের বার্তায় উল্লেখ করা হয়, ভারত যদি রাজি না হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।

সাগরে নৌবহর, মহাকাশে স্যাটেলাইট
মার্কিন নৌবহর যাত্রা শুরুর আগেই রুশ যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন তাদের ভারত মহাসাগরীয় নৌবহরের শক্তি বৃদ্ধি শুরু করে। দ্য এন্ডারসন পেপারসের বরাত দিয়ে মূলধারা: ৭১ বইয়ে লেখা হয়েছে, মার্কিন নৌবহর যখন বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি আসে তখন পাঁচটি সাবমেরিনসহ ১৬টি রুশ যুদ্ধ ও সরবরাহ জাহাজ বঙ্গোপসাগরে বা এর আশপাশে সমবেত হয়েছিল বলে জানা যায়।

সপ্তম নৌবহরটির গতিবিধি জানার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘কসমস ৪৬৪’ নামের পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটও উৎক্ষেপণ করে। আইএসএস ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, উপগ্রহটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর।

ইউপিএল প্রকাশিত ‘মূলধারা: ৭১’ বইয়ের তথ্য- মার্কিন নৌবাহিনী পৌঁছানো-সংক্রান্ত যে খবর দিল্লিতে যায়, সেটি অনুযায়ী কেবল বঙ্গোপসাগরে শক্তি প্রদর্শন নয়, বাংলাদেশের উপকূলের সঙ্গে সংযোগ প্রতিষ্ঠাও ছিল মার্কিন নৌবহরের প্রধান লক্ষ্য। এটি বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে যখন পৌঁছায়, ততদিনে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান।

দল নিষিদ্ধের ঘোষণা
ভারতের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে যখন মার্কিন নৌবহরের খবর নিয়ে আলাপ চলছিল, তখন মুক্ত যশোরে জনসভার আয়োজন (১১ ডিসেম্বর) করেছিল আওয়ামী লীগ। এতে ভাষণ দেন প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। 

আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন।

ভাষণে নজরুল ইসলাম ঘোষণা করেন, তাঁর সরকার বাংলাদেশের চারটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেগুলো হলো– মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নিজাম-ই-ইসলাম ও নুরুল আমিনের পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দল (আনন্দবাজার, ১২ ডিসেম্বর)। ওই জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও উপস্থিত ছিলেন। সেদিন চারটি সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এর মধ্যে একটি ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন।

১২ শহর মুক্ত
রণাঙ্গনে ১১ ডিসেম্বর তুমুল লড়াইয়ের পর ১২টি এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। আনন্দবাজারের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন মুক্ত হওয়া এলাকার মধ্যে ছিল– কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, জামালপুর, নোয়াখালী, হিলি, গাইবান্ধা, ফুলছড়ি, বাহাদুরিয়া, পিসাপাড়া, দুর্গাদিকি, বিগ্রাম ও চণ্ডীপুর।  

উত্তরাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর সদরদপ্তর ছিল বগুড়ায়। ১১ ডিসেম্বর মুক্তি ও মিত্রবাহিনী তখনও শহরটি থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে ছিল। আর ঢাকার পরিস্থিতি বোঝাতে আনন্দবাজারে লেখা হয়, ‘ঢাকার নিয়তি নির্দিষ্ট, এখন শুধু অপেক্ষা’।

আরও পড়ুন

×