ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিজয়ের মাস

সব অগ্রাহ্য করে ঢাকার দিকে এগিয়ে চলেন মুক্তিযোদ্ধারা

একাত্তরের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ চলে আসে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। ওই সময় দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও বইয়ে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজন

সব অগ্রাহ্য করে ঢাকার দিকে এগিয়ে চলেন মুক্তিযোদ্ধারা
×

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০৬ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর। বিকেল তখন ৫টা। ঢাকার একটি পরিবারের গৃহকর্ত্রী হঠাৎ অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে ছুটছেন পিজি হাসপাতালের দিকে। অ্যাম্বুলেন্স চলছিল ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের নির্জন রাস্তা ধরে। চারদিকে তখন বন্দুক আর গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ। মাঝে মধ্যে আসছে টানা মেশিনগানের গুলির আওয়াজ। 

সেদিনের সেই গৃহকর্ত্রী ছিলেন জাহানারা ইমাম। ঢাকায় যুদ্ধদিনের এমন চিত্রের কথা তুলে ধরেছেন ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ে। আগের দিনই (১২ ডিসেম্বর) ঢাকা দখলের অভিযান শুরু করেছে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী। সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতির আশঙ্কায় ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার পরিস্থিতি ছিল থমথমে। দিনের বিভিন্ন সময় বিমান নিয়ে টহল দেয় ভারতীয় বাহিনী। স্থলপথে এগোতে থাকা মুক্তি ও ভারতীয় সেনারা মূল শহর থেকে তখন বেশ কয়েক মাইল দূরে।

মুক্তিযুদ্ধের ১ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মইনুল হোসেন চৌধুরী তাঁর ব্যাটালিয়ন নিয়ে ছিলেন নরসিংদীতে। অবস্থান করছিলেন নরসিংদী রেলস্টেশনের আশপাশের এলাকায়। গন্তব্য ঢাকা। কিন্তু ১৩ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মিশ্র তাদের নরসিংদীতেই অবস্থানের নির্দেশ দেন। বিপরীতে ভারতীয় বাহিনী অগ্রসর হতে থাকে ঢাকার দিকে।

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় সেনারা নরসিংদী পেরিয়ে সামনে এগোয়। আরেক দল টাঙ্গাইল, মির্জাপুর মুক্ত করে জয়দেবপুরে যায়। অবরুদ্ধ ঢাকা থেকে ভারতীয় সেনাদের দূরত্ব তখন মাত্র ১১-১২ মাইল। 

এমন পরিস্থিতিতে পিছিয়ে থাকতে চাননি মুক্তি সেনারা। ব্রিগেডিয়ার মিশ্র তাদের নরসিংদীতে অবস্থান করে সেখানকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখতে বললেও, তা অগ্রাহ্য করেন মইনুল হোসেন চৌধুরী। ব্যাটালিয়ন নিয়ে রাতের বেলায় সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি তাঁর বই ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’-এ লিখেছেন, ‘আমার মনে পড়ল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বার্লিন দখলের জন্য মিত্রবাহিনীর প্রতিযোগিতার কথা। সেখানে কে আগে পৌঁছে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে তা নিয়েই রুশ ও অন্যান্য মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়েছিল। তাই আমরা ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম।’
পরদিন দুপুর বেলায় ব্যাটালিয়ন নিয়ে ডেমরায় পৌঁছান মেজর মইনুল। সঙ্গে ছিল দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় ৮০০ সৈনিক। এদিন ৩ নম্বর সেক্টরের কিছু মুক্তিযোদ্ধাও ডেমরায় পৌঁছান। শিল্পাঞ্চলের পেছনে অবস্থান নিলে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে থেমে থেমে গোলাগুলি চলতে থাকে। 

ঢাকা-পিন্ডিতে মতপার্থক্য
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর সিদ্ধান্তের বিভাজন স্পষ্ট হতে থাকে। রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থানরত সেনারা চাচ্ছিলেন চরম পরিণতি পর্যন্ত ভারতকে মোকাবিলা করে লড়াই চালিয়ে যেতে। কিন্তু ঢাকা ছিল এর ভিন্ন চিত্র।
সেদিন রাওয়ালপিন্ডিতে ছিলেন নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ম্যালকম ডব্লিউ ব্রাউন। কূটনৈতিক ও সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি লেখেন, পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তারা তাদের ভূখণ্ডের বিচ্ছিন্নতা মেনে নিতে চাননি। ভারতের সঙ্গে তাদের পরোক্ষ আলোচনারও কোনো সম্ভাবনা তখন ছিল না। সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র সেদিন বলেই বসেন, পূর্ব পাকিস্তান থেকে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত যে চিঠি জাতিসংঘে পাঠিয়েছেন (১০ ডিসেম্বর) তা ছিল অননুমোদিত। 

পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তারা যখন যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন পূর্ব পাকিস্তানের চিত্রটা ছিল ভিন্ন। এখানকার অধিনায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী। ১৩ ডিসেম্বর তিনি প্রথমবারের মতো যান ঢাকায় গভর্নরের দপ্তরে। সাক্ষাৎ করেন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলীর সঙ্গে। দুই দফায় আলাপের একপর্যায়ে তিনি যুদ্ধবিরতির চিঠি পাঠানোর নির্দেশ দেন।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা ফরমান আলী তাঁর বই ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেট’– এ তুলে ধরেছেন। সেটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে ইউপিএল। ফরমান আলী লিখেছেন, নিয়াজী চাচ্ছিলেন যুদ্ধবিরতির বার্তাটি গভর্নরের দপ্তর থেকে পাঠানো হোক। মূলত যুদ্ধে পরাজিত হলে তিনি সমস্ত দায়-দায়িত্ব গভর্নর হাউসের ওপর চাপাতে চাচ্ছিলেন। পরে এ নিয়ে আলাপ হলেও বার্তাটি আর পাঠানো হয়নি।  
ফরমান আলী উল্লেখ করেছেন, ওইদিন বেলা ১১টার দিকে গভর্নর হাউসে বিমান হামলা চালায় ভারতীয় বাহিনী। আক্রমণে দপ্তরের সামনের একটি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর গভর্নর (এ এম মালিক) পদত্যাগের কথা বলে মাটির নিচে নির্মিত শেল্টারে গিয়ে আশ্রয় নেন। তাঁর কথায় ইসলামাবাদের কর্ণপাত না করাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। 

বগুড়ার দিকে অগ্রযাত্রা
উত্তরাঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি ছিল বগুড়ায়। ১৩ ডিসেম্বর শহরটি দখলের অভিযানে নামে মিত্রবাহিনী। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জেকব তাঁর বই ‘স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকায়’ লিখেছেন, বগুড়ার দালানকোটা সমৃদ্ধ এলাকা ২০৫ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের অবশিষ্ট অংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানে পাকিস্তানিরা শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে লড়াই করে। এর মধ্যে যুদ্ধ থেমে যায়। ৩৪০ মাউন্টেন ব্রিগেড ২০ জন অফিসার ও অন্যান্য র‍্যাঙ্কের ৫০০ সৈন্যকে বন্দি করে বগুড়ার উত্তরাংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

আরও পড়ুন

×