ঔষধ শিল্প সমিতির সেমিনার
রাষ্ট্রের অতিনিয়ন্ত্রণে ওষুধ শিল্প দুর্বল
পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ঝুঁকিতে পড়বে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা
গাজীপুরের কালীগঞ্জে গতকাল ওষুধ শিল্প নিয়ে আয়োজিত কর্মশালায় ডা. জাকির হোসেন- সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের ওষুধ শিল্প গভীর সংকটে পড়েছে। গুটি কয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধ কোম্পানি এখন রুগ্ণ। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার পথে। এমন দাবি করেছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বাপি)। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ব্যাপক ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন সংগঠনটির নেতারা।
গতকাল শনিবার গাজীপুরের একটি রিসোর্টে বাপি আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি : প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে।
বাপি সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের ওষুধ শিল্পের শক্তি ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এখন সেই ভিত্তিই ভেঙে পড়ছে। তালিকাভুক্ত ১০০ ওষুধ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছে। বাকিগুলো নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে তালিকার ৫০ থেকে ১০০ নম্বর অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়।
তিনি বলেন, অনেক কোম্পানিকে ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে একই দামে ওষুধ বিক্রি করতে হচ্ছে। ১৯৯০ সালে যে দামে ওষুধ বিক্রি হতো, ২০২৫-২৬ সালেও সরকার সেই দাম বাড়াতে দিচ্ছে না। অথচ এই সময়ে উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্য, শ্রম ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যয় বহু গুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকা অসম্ভব।
সাংবাদিকদের সহায়তা চেয়ে বাপি সভাপতি বলেন, তারা যেন রুগ্ণ কোম্পানিগুলোর বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সরকারের প্রতি জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আমরা চাই সরকার এই ৬০ শতাংশ কোম্পানির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে কার্যকর নীতি সহায়তা দিক। ওষুধ শিল্পকে আবার ১৯৯৪ সালের ধারায় ফিরিয়ে আনুক। তাঁর মতে, দেশের ওষুধের স্বয়ংসম্পূর্ণতা রক্ষা এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ওষুধ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই।
আব্দুল মুক্তাদির ১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতিকে দেশের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের স্বর্ণ যুগের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই নীতির কারণে বাংলাদেশ ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি হয়। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্যমূলক নীতি ও বাস্তবতা বিবর্জিত সিদ্ধান্ত শিল্পকে দুর্বল করে ফেলেছে।
রাষ্ট্রীয় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তুলে ধরে তিনি ভেনেজুয়েলার উদাহরণ দেন। বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে একসময়ের সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও শিল্পকে ধ্বংস করে দিতে পারে, ভেনেজুয়েলা এর বাস্তব উদাহরণ। একই পথে হাঁটলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পও অকার্যকর হয়ে পড়বে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানি ধ্বংস হলে এর প্রভাব শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এসব কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে বড় কোম্পানিগুলো রপ্তানিমুখী হবে। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধের প্রাপ্যতা, দাম ও মান অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়াই সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করেছে। একই সঙ্গে এসব ওষুধের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
ডা. জাকির হোসেন বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও দাম নির্ধারণ কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। অথচ এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিল্পের কোনো অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। এমনকি বাপিকেও এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে শিল্পের আপত্তি নেই। তবে উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার বাস্তবতা বিবেচনা না করে দাম নির্ধারণ করলে তা টেকসই হয় না। অযৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ হালিমুজ্জামান, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ।
- বিষয় :
- ঔষধশিল্প
