এমআরডিআইর নীতি সংলাপে বক্তারা
গণমাধ্যমে যত স্বনিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের হস্তক্ষেপ তত কমবে
রাজধানীর ব্র্যাক ইন-এ গতকাল বুধবার এমআরডিআই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক নীতি সংলাপে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি এ. কে. আজাদ, ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী সারা হোসেন, এমআরডিআই নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর র
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৫ | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ১২:০৮
দেশের গণমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রণ কাঠামো আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর থাকবে, সরকার ও রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ তত কমবে। কারণ এর মাধ্যমে গণমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত হয় এবং গণমাধ্যম মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারে।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর ব্র্যাক ইনে ‘মিডিয়া সেলফ রেগুলেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে বক্তারা এ কথা বলেন। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) এ সংলাপের আয়োজন করে। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়নের পথ নিয়ে আলোচনা এবং সংবাদমাধ্যমে স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করার সম্ভাব্য কাঠামো মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। এমআরডিআইর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান সংলাপটি সঞ্চালনা করেন।
সংলাপে পলিসি পেপার উপস্থাপন করেন এমআরডিআইর প্রোগ্রামার সামিউল বাশার অনিক। এতে জানানো হয়, বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত সাংবাদিকতা চায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি জরিপ বলছে, ৬৮ শতাংশ মানুষ স্বাধীন গণমাধ্যম চায়। আর ৬০ শতাংশ চায় নিরপেক্ষতা। মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে– গণমাধ্যম স্বাধীন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ডেইলি স্টারের প্রকাশক ও সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, সেলফ রেগুলেশন (স্বনিয়ন্ত্রণ) যত কার্যকর হবে, সরকারি হস্তক্ষেপ তত কমবে। সেলফ রেগুলেশনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত, সাংবাদিকদের সম্মিলিতভাবে অঙ্গীকার করতে হবে– ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ পেশাগত কাজে প্রভাব ফেলবে না। একইভাবে মালিকদেরও স্পষ্টভাবে বলতে হবে– তারা তাদের গণমাধ্যমকে নিজের ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেবেন না। পাশাপাশি সম্পাদককে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ও কার্যকর পরিচালনার ক্ষমতা দিতে হবে।

মাহফুজ আনাম জানান, সম্পাদক পরিষদ এবং নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যথাক্রমে সম্পাদকদের জন্য এবং মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পরবর্তী ধাপে সাংবাদিকদের জন্যও একটি আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে।
নোয়াবের সভাপতি এ. কে. আজাদ বিগত সময়ে সাংবাদিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের উল্লেখ করে বলেন, সব সরকারের আচরণ একই। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ঠিক করতে না পারলে, তার সমালোচনা করতে না পরলে ভালো সাংবাদিকতা করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ. কে. আজাদ আরও বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় সমাধানের উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, একটি মিডিয়া কমিশন হবে, যেখানে সরকার যেমন অর্থায়ন করবে, তেমনি গণমাধ্যমগুলোও অর্থায়ন করবে এবং এটি স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে। সাংবাদিকদের ওপর কেউ অন্যায় করলে সেখানে বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকবে। আবার কোনো সংবাদমাধ্যম যদি অসত্য সংবাদ প্রকাশ করে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাতিসংঘের ইউনেস্কোর ঢাকা-প্রধান সুসান ভাইজ বলেন, গণমাধ্যমের জন্য প্রথম যে বিষয়টি প্রয়োজন সেটি হচ্ছে আস্থা অর্জন। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে সততা। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সাংবাদিকের সুরক্ষা। বিশ্বাসহীনতার কারণে মাঠে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হন।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার আস্থার ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত পাঠক, দর্শকের আস্থা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারব। তিনি বলেন, অনেক সময় সাংবাদিকরা অপসাংবাদিকতা করেন। এটা তারা শুধু নিজেদের জন্য করেন, তা নয়; মালিকদের জন্যও করতে বাধ্য হন। এসব বন্ধ করতে সেলফ রেগুলেশন দরকার। এখানে নোয়াব বা সম্পাদক পরিষদ-এর জন্য অপেক্ষা না করে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্যোগেই তা করতে পারে।

ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, প্রায়োগিক ব্যবস্থা ছাড়া গণমাধ্যমে স্বনিয়ন্ত্রণ কতটুকু কার্যকরী হবে, সেটা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ আছে। অনেক উন্নত দেশে স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন আমলে সংবাদমাধ্যমকে নানা নিপীড়নমূলক আইনের মাধ্যমে হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, এ সরকার যেহেতু রাজনৈতিক সরকার নয়, ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য তারা কিছু করবে। কিন্তু তারা নিজের তৈরি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনও বাস্তবায়ন করেনি। এ অবস্থায় আমরা নিজেদের সুরক্ষা নিজেরা কীভাবে তৈরি করব, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’ তিনি বলেন, গণমাধ্যম হিসেবে পাঠক বা মানুষের আস্থা অর্জন করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটা সংবাদমাধ্যমের অন্যতম সুরক্ষা কবচ হতে পারে। এই আস্থা অর্জনের অনুশীলন আমাদের শরীরচর্চার মতো প্রতিদিন করতে হবে।’
প্রতিটি দেশের গণতন্ত্রের চরিত্রের সঙ্গে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সম্পৃক্ত বলে মন্তব্য করেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সুস্থ গণমাধ্যম গড়ে ওঠেনি। প্রতিটি সরকারের সময়ে আমরা বাধাগ্রস্ত হয়েছি। তবে গত ১৫ বছরে এ বাধা দুর্বিষহ ছিল। গণমাধ্যমকে অবশ্যই স্বশাসিত হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
প্যানেল আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক ও ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের চেয়ারম্যান রেজোয়ানুল হক, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ, সাংবাদিক তালাত মামুন এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এস এম রেজওয়ান উল আলম, যশোর থেকে প্রকাশিত গ্রামের কাগজের সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন।
সুইডেন দূতাবাসের প্রথম সচিব পাওলা ক্যাস্ট্রো নিডারস্টামসহ বিভিন্ন দূতাবাস ও হাইকমিশনের প্রতিনিধি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মশিহুর রহমানসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, সংবাদমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরাও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
